সংক্ষেপে:
- আমিয়াখুম বান্দরবানের থানচি উপজেলার নাক্ষিয়ং এলাকায়, মিয়ানমার সীমান্তের কাছে — বাংলাদেশের দুর্গমতম জলপ্রপাতগুলোর একটি।
- যেতে হয় থানচি থেকে নৌকা ও কয়েক দিনের ট্রেকিংয়ে; গাইড ও প্রশাসনের অনুমতি বাধ্যতামূলক।
- সেরা সময় অক্টোবর–মার্চ; একই যাত্রায় দেখা যায় নাফাখুম, ভেলাখুম ও সাতভাইখুম।
- শিশু, বয়স্ক ও ট্রেকিংয়ে অনভিজ্ঞদের জন্য এই রুট উপযুক্ত নয়।
সূচিপত্র
- আমিয়াখুম কোথায়, কেন যাবেন
- কি দেখবেন: আমিয়াখুম ও আশপাশের খুম
- কখন যাবেন: সেরা সময়
- কিভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে থানচি পর্যন্ত
- থানচি থেকে আমিয়াখুম: দুই রুটের তুলনা
- ৪ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা
- খরচের আনুমানিক হিসাব
- কোথায় থাকবেন
- কোথায় খাবেন
- যা যা সঙ্গে নেবেন
- টিপস ও সতর্কতা
- প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
আমিয়াখুম কোথায়, কেন যাবেন
আমিয়াখুম জলপ্রপাত বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার নাক্ষিয়ং এলাকায় অবস্থিত — বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭৯ কিলোমিটার দূরে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা পাহাড়ি অঞ্চলে। মারমা ভাষায় ‘খুম’ মানে জলপ্রপাত, তবে খুম আর সাধারণ ঝর্ণার মধ্যে একটা পার্থক্য স্থানীয়রা করেন: ঝর্ণার ধারা শুকিয়ে যেতে পারে, কিন্তু খুমের পানি কখনো পুরোপুরি শুকায় না। আমিয়াখুম সেই অর্থে সত্যিকারের খুম — পাথরের ধাপ বেয়ে দুধসাদা ফেনা ছড়িয়ে নিচে নামে এর শীতল ধারা। একটি সূত্রে এর উচ্চতা আনুমানিক ২৫–৩৫ ফুট বলে উল্লেখ আছে, তবে এখানে উচ্চতার চেয়ে বড় আকর্ষণ হলো জায়গাটার দুর্গমতা আর চারপাশের নির্জনতা।
আমিয়াখুমে যাওয়া মানে শুধু একটা ঝর্ণা দেখা নয় — এটা একটা পূর্ণাঙ্গ অভিযান। সাঙ্গু নদী ধরে নৌকা, পাহাড়ি পাড়ায় রাত কাটানো, দেবতাপাহাড়ের খাড়া ঢাল পেরোনো — সব মিলিয়ে যাত্রাটাই এখানে গন্তব্যের মতোই বড় অভিজ্ঞতা। যারা ট্রেকিং ভালোবাসেন, তাদের কাছে এ কারণেই আমিয়াখুম বাংলাদেশের সেরা জলপ্রপাতগুলোর একটা বলে গণ্য হয়। তবে শুরুতেই সত্যিটা বলে রাখা ভালো: এটা সহজ ভ্রমণ নয়। শারীরিকভাবে ফিট না হলে, দল ছাড়া একা গেলে, কিংবা অনুমতি ছাড়া যাওয়ার চেষ্টা করলে এই যাত্রা বিপজ্জনক হতে পারে।
কি দেখবেন: আমিয়াখুম ও আশপাশের খুম
আমিয়াখুম জলপ্রপাত। পাথরের কয়েক ধাপে ভাগ হয়ে নেমে আসা জলধারা নিচে তৈরি করেছে গভীর, স্বচ্ছ কুণ্ড। চারপাশে খাড়া পাহাড় আর ঘন সবুজ, আর কানে লেগে থাকে পানির একটানা শব্দ। ঝর্ণার পাশে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে বোঝা যায় কেন এত কষ্টের পথ পেরিয়ে মানুষ এখানে আসে। গোসলের ক্ষেত্রে স্রোতের জোর আর পাথরের পিচ্ছিল ভাব মাথায় রাখতে হবে — গভীর জায়গায় না নামাই নিরাপদ।

দেবতাপাহাড়। থুইসাপাড়া থেকে আমিয়াখুমের পথে এই পাহাড়টাই আসল পরীক্ষা। পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচের দিকে তাকালে সাঙ্গুর উপত্যকা আর দূরের পাহাড়সারি দেখা যায়, তবে নামার পথটা খাড়া ও পিচ্ছিল। গাইডের দেখানো পথে, ধীরে ধীরে নামতে হয়। যারা উচ্চতায় ভয় পান, তাদের জন্য এই অংশটা মানসিকভাবেও কঠিন হতে পারে — দলে অভিজ্ঞ কেউ থাকলে সুবিধা হয়।

ভেলাখুম। আমিয়াখুমের ভাটিতে অবস্থিত এই সরু জলপথটির নাম এসেছে ‘ভেলা’ থেকে — পাথরের খাড়া দেয়ালের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খালে ভেলায় ভেসে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটাই এখানকার আকর্ষণ। পাথরের গায়ে হাত রেখে, ঠান্ডা পানির ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়ার সময় মনে হয় যেন পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমিয়াখুম দেখতে গেলে ভেলাখুম দেখার সময়টাও পরিকল্পনায় রাখুন।

সাতভাইখুম। আমিয়াখুমের উজানে অবস্থিত এই খুমটির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাত ভাইয়ের গল্প। একসঙ্গে কয়েকটি ধারায় পানি নেমে আসে এখানে, আর জায়গাটা আমিয়াখুমের চেয়ে আরও নির্জন। সময় থাকলে গাইডের সঙ্গে সাতভাইখুম ঘুরে আসা যায় — তবে ফেরার পথের সময় হিসাব করে তবেই এগোতে হবে, কারণ সন্ধ্যার পর পাহাড়ি পথে হাঁটা ঝুঁকিপূর্ণ।
পথের নাফাখুম ও রেমাক্রি। আমিয়াখুমের যাত্রায় বোনাস হিসেবে পাওয়া যায় আরও দুটি পরিচিত জায়গা। সাঙ্গু নদী ধরে নৌকায় যেতে যেতে পড়ে রেমাক্রি — নদীপাড়ের বাজার আর নৌকাঘাটের জায়গা। আর রেমাক্রি থেকে ট্রেকিংয়ে পৌঁছানো যায় প্রশস্ত ধারার নাফাখুম জলপ্রপাত। অনেকেই আমিয়াখুমের যাত্রায় নাফাখুমে কিছুক্ষণ কাটিয়ে তারপর থুইসাপাড়ার দিকে এগোন।

থুইসাপাড়া ও জিনাপাড়ার গ্রামজীবন। পাহাড়ি পাড়াগুলোতে রাত কাটানো এই যাত্রার আরেকটা মনে রাখার মতো অংশ। কাঠের মাচায় ঘুম, জুমের চালের ভাত, সন্ধ্যায় পাড়ার মানুষের সঙ্গে গল্প — শহরের জীবন থেকে এ একেবারেই আলাদা অভিজ্ঞতা। পাড়ার মানুষের রীতিনীতি ও ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করা এখানে ভ্রমণের অলিখিত নিয়ম।
কখন যাবেন: সেরা সময়
আমিয়াখুমে প্রায় সারা বছরই মানুষ যায়, তবে সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ — বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই সময় পাহাড়ি পথ শুকনো থাকে, সাঙ্গু নদীর পানি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং দিনের বেলায় হাঁটা সহজ হয়। বর্ষায় (জুন–সেপ্টেম্বর) ঝর্ণায় পানি সবচেয়ে বেশি থাকে, দেখতে সবচেয়ে ভরপুর লাগে — কিন্তু এই সময়ই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ: সাঙ্গু হঠাৎ ফুলে উঠতে পারে, ফ্ল্যাশ ফ্লাডের আশঙ্কা থাকে এবং প্রশাসন রুট বন্ধ করে দিতে পারে। গরমের মাসে (এপ্রিল–মে) পানি কমে যায়, তবে পথ শুকনো থাকায় ট্রেকিং করা যায়। প্রথমবার যারা যাচ্ছেন, তাদের জন্য শীতকালই নিরাপদ পছন্দ। যাত্রার ঠিক আগে গাইডের কাছ থেকে রুট খোলা আছে কি না জেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক — কাগজে-কলমে সেরা মৌসুমেও রুট বন্ধ থাকতে পারে।
কিভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে থানচি পর্যন্ত
ঢাকা থেকে বান্দরবান। ঢাকা থেকে বান্দরবানের উদ্দেশে রাতের বাস ছাড়ে; সকালে বান্দরবান শহরে পৌঁছে সেদিনই থানচির দিকে রওনা দেওয়া যায়। হাতে সময় রাখা ভালো, কারণ থানচির গাড়ি ধরতে দেরি হলে সেদিনের নৌকা আর ট্রেকিংয়ের সূচি এলোমেলো হয়ে যায়।
বান্দরবান থেকে থানচি। বান্দরবান শহর থেকে থানচি উপজেলা পর্যন্ত বাস বা জীপে (চান্দের গাড়ি) যেতে প্রায় ৪–৫ ঘণ্টা লাগে। পথ পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা, তাই সকাল সকাল রওনা দেওয়াই ভালো। থানচি পৌঁছে প্রথম কাজ — গাইড ঠিক করা। গাইড ছাড়া আমিয়াখুমের অনুমতি মেলে না, তাই গাইডের মাধ্যমেই প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। এ সময় জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্টুডেন্ট আইডির ফটোকপি লাগে; পথের চেকপোস্টেও এগুলো দেখাতে হয়।
থানচি থেকে রেমাক্রি। থানচি থেকে ইঞ্জিন নৌকায় সাঙ্গু নদী ধরে রেমাক্রি যেতে হয়। নদীপথের দুই ধারে পাহাড় আর পাড়া দেখতে দেখতে এই নৌকাযাত্রাটাই যাত্রার অন্যতম সুন্দর অংশ। দুপুরের মধ্যে রেমাক্রি পৌঁছাতে পারলে সেদিনই নাফাখুমের দিকে হাঁটা শুরু করা যায়।
থানচি থেকে আমিয়াখুম: দুই রুটের তুলনা
থানচি থেকে আমিয়াখুম যাওয়ার দুটি পরিচিত রুট আছে। প্রথম রুট: থানচি → পদ্মঝিরি → থুইসাপাড়া → দেবতাপাহাড় → আমিয়াখুম। এই পথে শুধু পদ্মঝিরি থেকেই প্রায় ৬–৭ ঘণ্টা ট্রেকিং করতে হয়, অনেক সময় রাতের বেলাতেও হাঁটতে হয় — তাই এটা অভিজ্ঞ ট্রেকারদের জন্য। দ্বিতীয় রুট: থানচি → রেমাক্রি → নাফাখুম → জিনাপাড়া → থুইসাপাড়া → দেবতাপাহাড় → আমিয়াখুম। এই পথে নৌকা ও ছোট ছোট ট্রেকিং মিলিয়ে এগোনো যায়, তাই প্রথমবারের জন্য দ্বিতীয় রুটটাই সুবিধাজনক বলে ধরা হয়। অনেক দল এক রুটে গিয়ে অন্য রুটে ফেরে — এতে দুই পথের অভিজ্ঞতাই পাওয়া যায়।
| বিষয় | পদ্মঝিরি রুট | রেমাক্রি–নাফাখুম রুট |
|---|---|---|
| পথ | থানচি → পদ্মঝিরি → থুইসাপাড়া | থানচি → রেমাক্রি → নাফাখুম → জিনাপাড়া → থুইসাপাড়া |
| ট্রেকিং | পদ্মঝিরি থেকে একটানা ৬–৭ ঘণ্টা, রাতেও হাঁটা লাগতে পারে | রেমাক্রি থেকে নাফাখুম ২–২.৫ ঘণ্টা, নাফাখুম থেকে থুইসাপাড়া ৩–৪ ঘণ্টা |
| কার জন্য | অভিজ্ঞ ট্রেকার | প্রথমবার যারা যাচ্ছেন, তাদের জন্য সুবিধাজনক |
| বাড়তি পাওনা | নির্জন পথ, কম ভিড় | নাফাখুম, রেমাক্রি ও পাড়াগুলো দেখা যায় |
যে রুটেই যান, থুইসাপাড়ায় পৌঁছে সেখানকার গাইডের সঙ্গে পরদিন ভোরে আমিয়াখুমের দিকে রওনা দিতে হয় — থুইসাপাড়া থেকে দেবতাপাহাড় পেরিয়ে আমিয়াখুম পৌঁছাতে প্রায় ৩–৩.৫ ঘণ্টা লাগে। দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা আগেই করে রাখুন, কারণ ঝর্ণার কাছে খাবারের কোনো দোকান নেই।
৪ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা
দিন ০ (রাত): ঢাকা থেকে রাতের বাসে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা। দিন ১: সকালে বান্দরবান পৌঁছে বাস/জীপে থানচি (৪–৫ ঘণ্টা); গাইড ঠিক করে অনুমতি নিয়ে নৌকায় রেমাক্রি; সেখান থেকে ট্রেকিংয়ে নাফাখুম দেখে জিনাপাড়া বা থুইসাপাড়ায় রাত। দিন ২: ভোরে থুইসাপাড়া থেকে দেবতাপাহাড় পেরিয়ে আমিয়াখুম; ভেলাখুম ও সাতভাইখুম ঘুরে বিকেলের মধ্যে থুইসাপাড়ায় ফিরে রাত। দিন ৩: থুইসাপাড়া থেকে রেমাক্রি (পদ্মঝিরি রুটে ফিরলে ভিন্ন অভিজ্ঞতা), নৌকায় থানচি, তারপর বান্দরবান শহরে রাত অথবা রাতের বাসে ঢাকার পথে। দিন ৪: সকালে ঢাকায় পৌঁছানো। যারা তিন্দু ঘুরতে চান, তারা থানচি-রেমাক্রি নৌকাপথের সূচি মিলিয়ে তিন্দুকে একই যাত্রায় জুড়ে নিতে পারেন — তবে এতে আরও এক দিন যোগ করতে হবে।
খরচের আনুমানিক হিসাব
নিচের অঙ্কগুলো আনুমানিক — সময়ের সঙ্গে ভাড়া বদলায়, তাই যাত্রার আগে গাইডের কাছ থেকে বর্তমান হার জেনে নিন। জীপ, নৌকা ও গাইডের খরচ পুরো দলের জন্য, তাই ৫–৬ জনের দলে ভাগ করে নিলে জনপ্রতি খরচ অনেক কমে।
| খাত | আনুমানিক খরচ | মন্তব্য |
|---|---|---|
| বান্দরবান–থানচি জীপ (রিজার্ভ) | ৫৫০০–৬০০০ টাকা | পুরো গাড়ির ভাড়া; বাসে গেলে জনপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা |
| থানচি–রেমাক্রি নৌকা (যাওয়া-আসা) | ৪০০০–৪৫০০ টাকা | এক নৌকায় ৫–৬ জন বসা যায় |
| গাইড (আমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম সার্কিট) | ৪৫০০–৫০০০ টাকা | থুইসাপাড়া থেকে স্থানীয় গাইডও লাগতে পারে |
| খাবার (পাড়ায়, প্রতি বেলা) | ১২০–১৫০ টাকা | জুম চালের ভাত, ডাল, সবজি, পাহাড়ি মুরগি ইত্যাদি |
| থাকা (পাড়ায়, প্রতি রাত) | জনপ্রতি ১৫০ টাকা | আদিবাসীদের ঘরে মাচায় থাকা |
ঢাকা–বান্দরবান যাতায়াত, বান্দরবান শহরে থাকা ও ব্যক্তিগত কেনাকাটা এর বাইরে। থানচির পর এটিএম বা মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা নেই বললেই চলে, তাই প্রয়োজনীয় নগদ টাকা থানচি থেকেই নিয়ে যান।
কোথায় থাকবেন
বান্দরবান শহরে রাত কাটাতে চাইলে সেখানকার হোটেলগুলো দেখে নিতে পারেন — বান্দরবানের সেরা হোটেল ও রিসোর্ট তালিকায় শহরের থাকার জায়গাগুলোর ধারণা পাবেন। থানচিতেও ছোট হোটেল ও গেস্টহাউস আছে। তবে থানচির পর আর কোনো হোটেল নেই — থাকতে হয় রেমাক্রি, নাফাখুম পাড়া, জিনাপাড়া ও থুইসাপাড়ার আদিবাসীদের ঘরে। থাকার ব্যবস্থা গাইডই করে দেন; সাধারণত মাচায় বিছানা পাতা থাকে। নিজের হালকা স্লিপিং ব্যাগ বা চাদর সঙ্গে রাখলে রাতের ঠান্ডায় সুবিধা হয়। দল বড় হলে আগে থেকে গাইডকে জানিয়ে রাখুন, যাতে পাড়ায় থাকার জায়গা ঠিক করে রাখা যায়।
কোথায় খাবেন
বান্দরবান ও থানচিতে: বাজারের ভাতের হোটেলে মাছ-মাংস-সবজি দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিন, আর থানচি থেকে শুকনো খাবার কিনে নিন। পাড়ায়: জুম চালের ভাত, ডাল, সবজি, আলু ভর্তা ও পাহাড়ি মুরগি — প্যাকেজ হিসাবে প্রতি বেলা ১২০–১৫০ টাকার মধ্যে খাওয়া যায়। কী খাবেন, তা গাইডের সঙ্গে আগেই ঠিক করে রাখুন। ট্রেকিংয়ের পথে: সঙ্গে রাখুন বিস্কুট, চকলেট, চিড়া, মুড়ি, খেজুর ও পর্যাপ্ত পানি; স্যালাইন ও গ্লুকোজ ক্লান্তি কাটাতে কাজে লাগে। ঝর্ণার কাছে কোনো দোকান নেই, তাই দুপুরের খাবার পাড়া থেকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়।
যা যা সঙ্গে নেবেন
- ভালো গ্রিপের ট্রেকিং জুতা (নতুন জুতা নয় — আগে পরা, পায়ে বসা জুতা)
- হালকা ব্যাকপ্যাক — ভারী ব্যাগ নিজেকেই বইতে হবে, তাই যত কম তত ভালো
- জাতীয় পরিচয়পত্র/স্টুডেন্ট আইডির ফটোকপি (২ কপি)
- ফার্স্ট এইড বক্স, নিজের নিয়মিত ওষুধ, স্যালাইন, গ্লুকোজ
- শুকনো খাবার, পানির বোতল, টর্চ, পাওয়ার ব্যাংক
- রেইনকোট বা পলিথিন (বর্ষায় ও নৌকায়), হালকা চাদর/স্লিপিং ব্যাগ
- নগদ টাকা — থানচির পর এটিএম সুবিধা নেই বললেই চলে
- বর্ষায় গেলে জোঁক থেকে বাঁচতে লম্বা মোজা ও লবণ
টিপস ও সতর্কতা
- গাইড ছাড়া যাওয়ার চেষ্টা করবেন না — অনুমতি মিলবে না, আর পথও চেনা যাবে না।
- যাত্রার আগে গাইডের কাছ থেকে জেনে নিন রুট খোলা আছে কি না; প্রশাসন মাঝে মাঝে আমিয়াখুম ভ্রমণ বন্ধ রাখে।
- থানচির পর থেকে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই বললেই চলে — প্রয়োজনীয় ফোন থানচিতে থাকতেই সেরে নিন, পরিবারকে আগেই জানিয়ে রাখুন কয়েক দিন যোগাযোগের বাইরে থাকবেন।
- দেবতাপাহাড়ের খাড়া ঢালে গাইডের নির্দেশ ছাড়া এগোবেন না; ভেজা পাথরে পা পিছলে যাওয়া এই রুটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
- বর্ষায় সাঙ্গু নদীর পানি বাড়লে নৌকা বা ট্রেকিংয়ে জোর করবেন না — ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ঝুঁকি প্রাণঘাতী হতে পারে।
- দল করে যান — খরচ কমে, বিপদে সাহায্য মেলে; দলে ট্রেকিংয়ে অভিজ্ঞ কেউ থাকলে আরও ভালো।
- শিশু ও বয়স্কদের এই রুটে না নেওয়াই ভালো; শারীরিকভাবে ফিট হলেই তবে যান।
- পাড়ার মানুষের রীতিনীতি ও ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করুন; ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
- প্লাস্টিক ও আবর্জনা ফেলে আসবেন না — যা নিয়ে যাবেন, তা ফিরিয়ে আনুন।
- আরও তথ্যের জন্য দেখুন উইকিপিডিয়ায় আমিয়াখুম জলপ্রপাত ও অফরোড বাংলাদেশের আমিয়াখুম পরিচিতি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
আমিয়াখুম যেতে কত দিন সময় লাগে?
ঢাকা থেকে যাতায়াতসহ সাধারণত ৪ দিনের পরিকল্পনা করতে হয়। প্রথম দিন বান্দরবান থেকে থানচি হয়ে রেমাক্রি ও নাফাখুম পেরিয়ে থুইসাপাড়ায় রাত কাটানো, দ্বিতীয় দিন আমিয়াখুম দেখে ফেরা, তৃতীয় দিন থানচি হয়ে বান্দরবানে ফেরা — এই ছকটাই সবচেয়ে প্রচলিত। তাড়াহুড়ো করে ৩ দিনেও করা যায়, তবে পাহাড়ি পথে বিশ্রামের সময় রাখা নিরাপদ।
গাইড ছাড়া কি আমিয়াখুম যাওয়া যায়?
না, গাইড ছাড়া আমিয়াখুম যাওয়ার অনুমতি মেলে না। থানচি থেকে স্থানীয় গাইড নিয়ে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয় এবং পথের চেকপোস্টে কাগজপত্র দেখাতে হয়। গাইডই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন এবং দেবতাপাহাড়ের মতো কঠিন অংশে পথ দেখান, তাই গাইড এখানে বিলাসিতা নয়, বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা।
আমিয়াখুম যাওয়ার সেরা সময় কোনটি?
ট্রেকিংয়ের জন্য সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ, বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি — তখন পথ শুকনো থাকে, সাঙ্গু নদীর পানি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হাঁটা তুলনামূলক সহজ হয়। বর্ষায় (জুন–সেপ্টেম্বর) ঝর্ণায় পানি বেশি থাকে, কিন্তু সাঙ্গু ফুলে ওঠে এবং ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ঝুঁকি থাকে বলে অনেক সময় রুট বন্ধও থাকে।
আমিয়াখুম ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক কত খরচ হয়?
খরচ দলের আকারের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে, কারণ জীপ, নৌকা ও গাইডের খরচ ভাগাভাগি হয়। আনুমানিক হিসাবে থানচি থেকে রেমাক্রি নৌকা যাওয়া-আসা ৪০০০–৪৫০০ টাকা, পুরো সার্কিটের গাইড ৪৫০০–৫০০০ টাকা, পাড়ায় প্রতি বেলা খাবার ১২০–১৫০ টাকা ও রাতের থাকা জনপ্রতি ১৫০ টাকা ধরা হয়। ৫–৬ জনের দলে ঢাকা–বান্দরবান যাতায়াত বাদে জনপ্রতি খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কমে আসে।
দেবতাপাহাড় পার হওয়া কি খুব কঠিন?
হ্যাঁ, দেবতাপাহাড় আমিয়াখুম যাত্রার সবচেয়ে কঠিন অংশ। থুইসাপাড়া থেকে আমিয়াখুমের পথে এই পাহাড়ের খাড়া ও পিচ্ছিল ঢাল বেয়ে নামতে হয়, যেখানে একটু অসতর্ক হলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এই অংশে গাইডের নির্দেশ মেনে ধীরে নামা, ভালো গ্রিপের জুতা পরা এবং ব্যাগ হালকা রাখা জরুরি।
আমিয়াখুম যাওয়ার জন্য কী কী কাগজপত্র লাগে?
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে স্টুডেন্ট আইডির ফটোকপি অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে — মূল কপি না থাকলেও ফটোকপি চলে। থানচিতে গাইডের মাধ্যমে অনুমতি নেওয়ার সময় এবং পথের চেকপোস্টে এগুলো দেখাতে হয়। যাত্রার আগে গাইডের কাছ থেকে জেনে নিন রুটটি খোলা আছে কি না, কারণ প্রশাসন মাঝে মাঝে আমিয়াখুম ভ্রমণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে।
