সংক্ষেপে: ছেঁড়া দ্বীপ (Cheradia) বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের ভূখণ্ড — সেন্টমার্টিন থেকে প্রায় 5 কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে এক জনশূন্য প্রবাল দ্বীপ। ভাটার সময় হেঁটে যাওয়া যায়, জোয়ারে মাঝের পথ ডুবে যায়। এখানে নেই থাকার ব্যবস্থা, নেই ভালো খাবারের দোকান — আছে শুধু প্রবাল পাথর, নারিকেল গাছ, নীল জল আর সূর্যাস্ত। এই গাইডে পাবেন যাওয়ার তিনটি উপায়, আনুমানিক খরচ, হেঁটে যাওয়ার নিয়ম, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ও সতর্কতা।
সতর্কতা: জাহাজ চলাচল, অনুমতি ও পর্যটন সংক্রান্ত নিয়ম মৌসুমভেদে বদলায়। যাত্রার আগে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ কোম্পানি বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করে নিন। নিচের সব ভাড়া ও খরচ আনুমানিক — মৌসুম ও দরদামে বদলাতে পারে।
সূচিপত্র
- ছেঁড়া দ্বীপ কোথায় ও কেন আলাদা
- ছেঁড়া দ্বীপে যা যা দেখবেন
- যাওয়ার সেরা সময়
- ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথ
- সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়া দ্বীপ: তিনটি উপায়
- হেঁটে ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়ার সম্পূর্ণ নিয়ম
- ছেঁড়া দ্বীপ একদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা
- কোথায় থাকবেন
- কোথায় খাবেন
- খরচের ধারণা
- টিপস ও সতর্কতা
- প্রশ্নোত্তর
ছেঁড়া দ্বীপ কোথায় ও কেন আলাদা
ছেঁড়া দ্বীপ কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের অন্তর্গত। সেন্টমার্টিন মূল দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় 5 কিলোমিটার দক্ষিণে, নাফ নদীর মোহনার কাছে বঙ্গোপসাগরে এর অবস্থান। ভাটার সময় এটি সেন্টমার্টিনের সঙ্গে বালুচর ও প্রবাল পথে যুক্ত থাকে; জোয়ার উঠলেই মাঝের অংশ সমুদ্রে ডুবে যায় এবং এটি আলাদা দ্বীপ হয়ে ওঠে। এই ভাঙা-জোড়ার চরিত্র থেকেই এর নাম — ছেঁড়া দ্বীপ, যার অর্থ দাঁড়ায় ছেঁড়া বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।
স্থানীয় মানুষের কাছে দ্বীপটি ছেঁড়াদিয়া বা সিরাদিয়া নামে পরিচিত। ভূখণ্ড হিসেবে এটি বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের অংশ — অর্থাৎ এর দক্ষিণে আর বাংলাদেশের কোনো স্থলভূমি নেই। আয়তনে এটি খুব ছোট; দক্ষিণে 100 থেকে 500 বর্গমিটার আয়তনের ছোট ছোট চর মিলিয়ে দ্বীপটি গঠিত। এখানে কোনো স্থায়ী বসতি নেই, নেই বিদ্যুৎ-পানির ব্যবস্থা। পুরো দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রবাল পাথর, বালুচর, কেয়া ঝোপ আর নারিকেল গাছ।
একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার থাকা ভালো: ছেঁড়া দ্বীপ কোনো রিসোর্ট দ্বীপ নয়। এখানে ঘুরতে যাওয়া মানে প্রকৃতির মুখোমুখি হওয়া — পায়ের নিচে প্রবাল পাথর, মাথার ওপর খোলা আকাশ, চারপাশে নীল জল। যারা নির্জনতা, ফটোগ্রাফি আর সাগরের আসল রূপ দেখতে চান, তাদের জন্য এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গন্তব্য। তবে যারা আরামদায়ক সুবিধা খোঁজেন, তাদের জন্য দিনের বেলা ঘুরে সেন্টমার্টিনে ফেরাই সঠিক পরিকল্পনা।

ছেঁড়া দ্বীপে যা যা দেখবেন
প্রবাল পাথরের সৈকত: ছেঁড়া দ্বীপের সবচেয়ে চেনা দৃশ্য হলো এর প্রবাল সৈকত। সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা আকৃতির প্রবাল পাথর — কোনোটা গোল, কোনোটা শাখার মতো, কোনোটা চ্যাপ্টা। জোয়ারের ঢেউ এসে যখন এই পাথরে আছড়ে পড়ে, তখন সাদা ফেনা আর নীল জলের মিশেলে এক অন্যরকম দৃশ্য তৈরি হয়। হাঁটার সময় খালি পায়ে না হেঁটে শক্ত স্যান্ডেল বা জুতা পরুন, কারণ প্রবাল পাথর ধারালো হতে পারে। আর মনে রাখবেন, প্রবাল সংগ্রহ করা বা ভেঙে নেওয়া আইনত নিষিদ্ধ এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর — ছবি তুলুন, পাথর রেখে আসুন।
নারিকেল গাছ আর কেয়া ঝোপ: দ্বীপের মাঝখানে ও ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে নারিকেল গাছের সারি আর কেয়া ঝোপ। সেন্টমার্টিনকে যেমন নারিকেল জিঞ্জিরা বলা হয়, ছেঁড়া দ্বীপও সেই একই চরিত্রের — সবুজ গাছ, বালু আর নীল সাগরের মিশেল। দুপুরের রোদে এই গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া যায়, তবে গাছের নিচে বসার সময় ঝরে পড়া ডাব থেকে সাবধান থাকুন।
স্বচ্ছ নীল জল ও সামুদ্রিক জীবন: ছেঁড়া দ্বীপের চারপাশের জল সেন্টমার্টিনের অন্যান্য সৈকতের চেয়ে স্বচ্ছ। ভাটার সময় অগভীর জলে প্রবাল, ছোট মাছ আর শামুক-ঝিনুক দেখা যায়। স্নরকেলিং করতে চাইলে সেন্টমার্টিন থেকে সরঞ্জাম ভাড়া করে আনা যায়, তবে সাঁতার না জানলে গভীর জলে নামবেন না এবং স্রোতের দিক খেয়াল রাখুন। সেন্টমার্টিন অঞ্চলে প্রায় 66 প্রজাতির প্রবাল ও নানা সামুদ্রিক প্রাণীর কথা গবেষণায় উঠে এসেছে — এই জীববৈচিত্র্যই দ্বীপের আসল সম্পদ।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত: ছেঁড়া দ্বীপ থেকে সূর্যাস্ত দেখা ভ্রমণকারীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিজ্ঞতা। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডোবার সময় পুরো সাগর কমলা-সোনালি রঙ ধারণ করে। আবার ভোরে এলে পূর্ব আকাশে সূর্যোদয়ও দেখা যায়। তবে সূর্যাস্ত দেখে ফিরতে হলে আলো থাকতেই রওনা দিন — অন্ধকারে প্রবাল পাথরের ওপর দিয়ে ফেরা বিপজ্জনক।
পাখি ও নির্জনতা: জনশূন্য হওয়ায় ছেঁড়া দ্বীপে পাখির আনাগোনা বেশি। সকালে ও বিকেলে নানা সামুদ্রিক পাখি দেখা যায়। যারা কোলাহল এড়িয়ে কিছুক্ষণ একা থাকতে চান, তাদের জন্য এই নির্জনতাই দ্বীপের বড় আকর্ষণ। পূর্ণিমার রাতে অনেকে এখানে ক্যাম্পিংয়ের কথা ভাবেন, তবে রাতে থাকার অনুমতি, নিরাপত্তা ও জোয়ারের বিষয়টি আগেই স্থানীয় প্রশাসন ও গাইডের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া জরুরি।

যাওয়ার সেরা সময়
ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণের সেরা সময় নভেম্বর থেকে মার্চ। এই সময় সাগর তুলনামূলক শান্ত থাকে, আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ চলাচল নিয়মিত থাকে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পর্যটকের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে, তাই থাকার জায়গা আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া ভালো।
এপ্রিল থেকে অক্টোবর বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে সাগর উত্তাল হতে পারে, জাহাজ চলাচল অনিয়মিত হয় এবং ছোট নৌকায় ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই সময়ে গেলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে এবং স্থানীয় মাঝিদের পরামর্শ নিয়ে তবেই সিদ্ধান্ত নিন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: সেন্টমার্টিনে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা সময়ে সময়ে বদলায় — 2025 সাল থেকে এ নিয়ে নতুন বিধিনিষেধের কথাও শোনা গেছে। তাই যাত্রার আগে সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা আবশ্যক।
ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথ
ছেঁড়া দ্বীপ যেতে হলে প্রথমে সেন্টমার্টিন পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে যাত্রা সাধারণত দুই ধাপে হয় — ঢাকা থেকে কক্সবাজার বা টেকনাফ, তারপর জাহাজে সেন্টমার্টিন।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার/টেকনাফ: ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ, আরামবাগ ও কল্যাণপুর থেকে রাতে কক্সবাজারগামী বাস ছাড়ে। নন-এসি ও এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক 900 থেকে 2,500 টাকার মধ্যে (শ্রেণিভেদে)। সময় লাগে প্রায় 10-12 ঘণ্টা। সরাসরি টেকনাফগামী বাসও পাওয়া যায়; টেকনাফ থেকে জাহাজ ধরলে পথ কিছুটা কমে। বিমানে গেলে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দর, সেখান থেকে সড়কে টেকনাফ বা কক্সবাজার ঘাট।
জাহাজে সেন্টমার্টিন: মৌসুমে টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ চলে। জাহাজ সাধারণত সকালে ছাড়ে এবং পৌঁছাতে 3-5 ঘণ্টা লাগে (ঘাটভেদে)। জনপ্রতি ভাড়া শ্রেণিভেদে আনুমানিক 1,000 থেকে 2,500 টাকা। তবে কোন ঘাট থেকে কোন মৌসুমে জাহাজ চলবে, তা বদলায় — তাই টিকিট কাটার আগে জাহাজ কোম্পানির সর্বশেষ সময়সূচি দেখে নিন। জাহাজের টিকিটের সঙ্গে অনেক সময় সেন্টমার্টিনে ফেরার দিনও ঠিক রাখতে হয়।
সেন্টমার্টিনে পৌঁছে: জেটিতে নেমে হোটেল বা রিসোর্টে ব্যাগ রেখে, হালকা খাবার খেয়ে ছেঁড়া দ্বীপের পরিকল্পনা করুন। জোয়ার-ভাটার সময় জানতে জেটি এলাকার মাঝি বা হোটেলের কর্মীদের জিজ্ঞেস করুন — তারাই সেদিনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারবেন।

সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়া দ্বীপ: তিনটি উপায়
১. শেয়ার নৌকা বা ট্রলার: সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় উপায়। সেন্টমার্টিনের জেটি থেকে ছেঁড়া দ্বীপগামী ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোট পাওয়া যায়। মৌসুমভেদে জনপ্রতি আনুমানিক 100-200 টাকায় যাওয়া-আসা করা যায়। নৌকায় সময় লাগে প্রায় 30-45 মিনিট (সাগরের অবস্থাভেদে)। যাত্রার আগে ভাড়া, যাওয়ার সময় এবং ফেরার সময় — তিনটিই ঠিক করে নিন।
২. রিজার্ভ স্পিডবোট বা ট্রলার: পরিবার বা বন্ধুদের দল একসঙ্গে গেলে পুরো নৌকা রিজার্ভ করা সুবিধাজনক। এতে নিজের সময়মতো যাওয়া-আসা যায় এবং দ্বীপে কতক্ষণ থাকবেন তা নিজেরাই ঠিক করতে পারেন। রিজার্ভ ভাড়া নৌকার ধরন ও দলভেদে আনুমানিক 1,000-2,500 টাকা হতে পারে — দরদাম করে নিন এবং ফেরার সময় লিখিতভাবে বা অন্তত স্পষ্টভাবে ঠিক করুন।
৩. হেঁটে বা সাইকেলে: হাতে সময় থাকলে এবং ভাটা মিলে গেলে হেঁটে বা সাইকেল ভাড়া নিয়ে ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়া যায়। এটি সবচেয়ে স্মরণীয় উপায়, তবে সবচেয়ে বেশি পরিকল্পনা দাবি করে — বিস্তারিত পরের অংশে। সাইকেল ভাড়া সেন্টমার্টিনের জেটি ও বাজার এলাকায় পাওয়া যায়; ভাড়া দরদাম করে ঠিক করুন।

হেঁটে ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়ার সম্পূর্ণ নিয়ম
ভাটার সময় সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ছেঁড়া দ্বীপ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া যায়। হাঁটতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। এই হাঁটা পথের পুরোটাই বালুচর, প্রবাল পাথর আর অগভীর জলের ওপর দিয়ে — তাই শক্ত জুতা বা স্যান্ডেল, টুপি, সানস্ক্রিন আর পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে নিন।
যেভাবে পরিকল্পনা করবেন: প্রথমে সেদিনের ভাটার সময় জেনে নিন। ভাটা শুরু হওয়ার পরপরই রওনা দিন, যাতে পুরো পথ ভাটার মধ্যেই পার হওয়া যায়। পথে দু-এক জায়গায় হাঁটুসমান জল পার হতে হতে পারে — ব্যাগ ওয়াটারপ্রুফ কভারে রাখুন, মোবাইল পলিথিনে মুড়ে নিন। দল বেঁধে যান, একা হাঁটা এড়িয়ে চলুন। পথে স্থানীয় জেলে বা মাঝিদের দেখা মিললে পথের অবস্থা জিজ্ঞেস করে নিন।
ফেরার নিয়ম — সবচেয়ে জরুরি: ছেঁড়া দ্বীপে পৌঁছে ঘড়ি দেখে ফেরার সময় ঠিক করুন। জোয়ার আসার অন্তত এক ঘণ্টা আগেই ফেরার পথ ধরুন। জোয়ার উঠলে মাঝের পথ ডুবে যায় এবং হেঁটে ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়ে — তখন নৌকা ছাড়া ফেরার উপায় থাকে না, আর সন্ধ্যায় নৌকা পাওয়াও কঠিন। সূর্যাস্ত দেখে হেঁটে ফেরার পরিকল্পনা তাই ঝুঁকিপূর্ণ; সূর্যাস্ত দেখতে চাইলে নৌকায় যান এবং নৌকার ফেরার সময় আগেই ঠিক করে রাখুন।
যা সঙ্গে নেবেন: পানি, শুকনো খাবার, টুপি, সানস্ক্রিন, শক্ত স্যান্ডেল, পাওয়ার ব্যাংক, প্রাথমিক ওষুধ। আর অবশ্যই সঙ্গে নেওয়া প্লাস্টিকের বোতল ও প্যাকেট ফেরত আনুন — জনশূন্য দ্বীপে ময়লা ফেলার কোনো ব্যবস্থা নেই।
ছেঁড়া দ্বীপ একদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা
সকাল: সেন্টমার্টিনে নাশতা সেরে জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিন। নৌকায় গেলে সকাল 9টার মধ্যে জেটিতে পৌঁছান; হেঁটে গেলে ভাটা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিন।
দুপুর: ছেঁড়া দ্বীপে পৌঁছে প্রবাল সৈকতে হাঁটুন, ছবি তুলুন, অগভীর জলে পা ভেজান। সঙ্গে আনা শুকনো খাবার ও ডাব খেয়ে নিন। দুপুরের কড়া রোদে ছায়ায় বিশ্রাম নিন।
বিকেল: বিকেলের নরম আলোয় আবার সৈকতে হাঁটুন। ফেরার সময়ের আগেই নৌকা বা হাঁটাপথ ধরুন। সূর্যাস্ত দেখতে চাইলে নৌকায় যান এবং ফেরার নৌকা আগেই ঠিক রাখুন।
সন্ধ্যা: সেন্টমার্টিনে ফিরে জেটি এলাকার রেস্তোরাঁয় সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ বা স্থানীয় খাবার খান। পরদিনের জাহাজের টিকিট ও সময় আরেকবার নিশ্চিত করে নিন।
কোথায় থাকবেন
ছেঁড়া দ্বীপে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই — রাত কাটাতে হবে সেন্টমার্টিনে। সেন্টমার্টিনে জেটি এলাকা, উত্তর বিচ, পশ্চিম বিচ ও দক্ষিণ বিচজুড়ে নানা মানের হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ আছে। মৌসুমভেদে ভাড়া আনুমানিক 1,500 থেকে 10,000 টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। পিক সিজনে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) ও ছুটির দিনে ভাড়া বাড়ে, তাই আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
বাজেটের জন্য কটেজ ও গেস্ট হাউজ, আরামদায়ক থাকার জন্য বিচের ধারের রিসোর্ট — দুই ধরনের ব্যবস্থাই আছে। সেন্টমার্টিনের সেরা হোটেল ও রিসোর্টগুলোর তুলনা দেখতে পারেন আমাদের সেন্টমার্টিনের সেরা 10টি হোটেল ও রিসোর্ট পোস্টে। বুকিংয়ের সময় জিজ্ঞেস করে নিন — রুম থেকে বিচ কত দূরে, জেনারেটর/বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন, খাবারের ব্যবস্থা আছে কি না।
কোথায় খাবেন
সেন্টমার্টিনে নাশতা: যাত্রা শুরুর আগে হোটেল বা জেটি এলাকার রেস্তোরাঁয় নাশতা সেরে নিন। পরোটা-ডিম-সবজি, খিচুড়ি বা ভাত — সাধারণ বাঙালি খাবার সহজেই পাওয়া যায়।
ছেঁড়া দ্বীপে: এখানে দু-একটি চায়ের দোকান, ডাব আর তরমুজ ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তাই পানি, শুকনো খাবার, বিস্কুট, ফল সঙ্গে নিয়ে যান। প্লাস্টিকের বোতল ও প্যাকেট সঙ্গে ফেরত আনুন।
ফিরে সেন্টমার্টিনে দুপুর/রাতের খাবার: সেন্টমার্টিনের জেটি ও বাজার এলাকায় সামুদ্রিক মাছ, কোরাল, লবস্টার ও কাঁকড়ার রেস্তোরাঁ আছে। তাজা মাছ বেছে নিয়ে রান্না করিয়ে খাওয়া এখানকার জনপ্রিয় অভিজ্ঞতা। দাম মাছের ধরন ও ওজনের ওপর নির্ভর করে — অর্ডারের আগে দাম ঠিক করে নিন।
কাছাকাছি আরও দ্বীপ ভ্রমণের ধারণা চাইলে দেখতে পারেন মহেশখালী ভ্রমণ গাইড এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের আশপাশের হিমছড়ি ভ্রমণ গাইড।
খরচের ধারণা
নিচের খরচগুলো জনপ্রতি আনুমানিক ধারণা — মৌসুম, দরদাম ও সুবিধার মান অনুযায়ী বদলাতে পারে।
| খাত | আনুমানিক খরচ |
|---|---|
| ঢাকা–কক্সবাজার/টেকনাফ বাস (একমুখী) | 900–2,500 টাকা |
| জাহাজে সেন্টমার্টিন (জনপ্রতি, শ্রেণিভেদে) | 1,000–2,500 টাকা |
| সেন্টমার্টিন–ছেঁড়া দ্বীপ শেয়ার নৌকা (জনপ্রতি) | 100–200 টাকা |
| রিজার্ভ নৌকা/স্পিডবোট (দলভেদে) | 1,000–2,500 টাকা |
| সেন্টমার্টিনে থাকা (প্রতি রাত) | 1,500–10,000 টাকা |
| খাওয়া (দিনপ্রতি, জনপ্রতি) | 500–1,500 টাকা |
দুই দিনের সেন্টমার্টিন–ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণে জনপ্রতি মোট খরচ সাধারণত আনুমানিক 6,000–15,000 টাকার মধ্যে হয় (ঢাকা থেকে যাতায়াত ও থাকা ধরে)।
টিপস ও সতর্কতা
জোয়ার-ভাটাই মূল চাবিকাঠি: ছেঁড়া দ্বীপের সব পরিকল্পনা জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে। যাত্রার দিন সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে সময় জেনে নিন, মোবাইলের জোয়ার-ভাটা অ্যাপের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবেন না।
প্রবাল ধরবেন না, ভাঙবেন না: প্রবাল এই দ্বীপের প্রাণ। প্রবাল সংগ্রহ বা ভাঙা পরিবেশের ক্ষতি করে এবং এ নিয়ে বিধিনিষেধ আছে। ছবি তুলুন, স্মৃতি নিয়ে ফিরুন।
পানি ও খাবার সঙ্গে নিন: দ্বীপে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত পানি ও শুকনো খাবার ছাড়া যাবেন না।
সাঁতারে সতর্কতা: সাঁতার না জানলে গভীর জলে নামবেন না। স্রোত ও জোয়ারের টান সম্পর্কে মাঝিদের কাছ থেকে জেনে নিন।
রোদ ও পোকার সুরক্ষা: খোলা দ্বীপে ছায়া কম। টুপি, সানস্ক্রিন, সানগ্লাস নিন। সন্ধ্যায় মশা থাকতে পারে — সেন্টমার্টিনে ফিরে মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা রাখুন।
মোবাইল নেটওয়ার্ক: সেন্টমার্টিনে নেটওয়ার্ক থাকলেও ছেঁড়া দ্বীপের দিকে তা দুর্বল হতে পারে। জরুরি নম্বর ও ফেরার পরিকল্পনা আগেই ঠিক রাখুন।
পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন: প্লাস্টিক, বোতল, প্যাকেট — সব সঙ্গে ফেরত আনুন। জনশূন্য দ্বীপে ফেলা ময়লা সাগরে গিয়ে প্রবালের ক্ষতি করে।
আরও তথ্যের জন্য দেখতে পারেন Chhera Island — Wikipedia, সেন্টমার্টিন ভ্রমণ — UNB এবং Mesmerising islands of Bangladesh — The Daily Star।
প্রশ্নোত্তর
ছেঁড়া দ্বীপ কোথায় অবস্থিত?
ছেঁড়া দ্বীপ কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের অন্তর্গত, সেন্টমার্টিন মূল দ্বীপ থেকে প্রায় 5 কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের ভূখণ্ড। স্থানীয়ভাবে দ্বীপটি ছেঁড়াদিয়া বা সিরাদিয়া নামেও পরিচিত।
ছেঁড়া দ্বীপে হেঁটে যাওয়া যায় কি?
হ্যাঁ, ভাটার সময় হেঁটে যাওয়া যায়। সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ভাটার সময় হেঁটে ছেঁড়া দ্বীপ পৌঁছাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাগে। তবে জোয়ার আসার আগেই ফিরতে হবে, কারণ জোয়ারের সময় মাঝের পথ সমুদ্রের পানিতে ডুবে যায়। স্থানীয়দের কাছ থেকে সেদিনের জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিয়ে তবেই হাঁটা শুরু করুন।
সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়া দ্বীপ যেতে নৌকা ভাড়া কত?
মৌসুমভেদে শেয়ার নৌকা বা ট্রলারে জনপ্রতি আনুমানিক 100-200 টাকায় ছেঁড়া দ্বীপ ঘুরে আসা যায়। পুরো নৌকা বা স্পিডবোট রিজার্ভ করলে খরচ বেশি হবে এবং তা দরদামের ওপর নির্ভর করে। ভাড়া যাত্রার আগে ঠিক করে নিন এবং ফেরার সময়টাও আগেই ঠিক করে রাখুন।
ছেঁড়া দ্বীপে রাতে থাকা যায় কি?
না, ছেঁড়া দ্বীপে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই — এটি জনশূন্য দ্বীপ। রাতে থাকতে হলে সেন্টমার্টিনে ফিরে হোটেল, রিসোর্ট বা কটেজে থাকতে হবে। সেন্টমার্টিনে আনুমানিক 1,500 থেকে 10,000 টাকার মধ্যে বিভিন্ন মানের থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়।
ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়ার সেরা সময় কোনটি?
নভেম্বর থেকে মার্চ — শীতকালই ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণের সেরা সময়, তখন সাগর তুলনামূলক শান্ত থাকে এবং জাহাজ চলাচল নিয়মিত থাকে। বর্ষায় সাগর উত্তাল হয় এবং যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে যাত্রার আগে জাহাজ চলাচল ও অনুমতি সংক্রান্ত সর্বশেষ নির্দেশনা অবশ্যই যাচাই করে নিন।
ছেঁড়া দ্বীপে খাবারের ব্যবস্থা আছে কি?
প্রায় নেই বললেই চলে — দু-একটি চায়ের দোকান, ডাব আর তরমুজ ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তাই পানি, শুকনো খাবার ও হালকা খাবার সঙ্গে নিয়ে যান। মূল খাবার সেন্টমার্টিনে ফিরে খাওয়াই ভালো।
