সংক্ষেপে: দেবতাখুম বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে তারাছা খালের গভীর গিরিখাত — স্থানীয়দের ভাষায় “খুমের রাজা”। বান্দরবান শহর থেকে কচ্ছপতলী বাজার হয়ে প্রায় ১-২ ঘণ্টার ট্রেক, তারপর বাঁশের ভেলায় নীল পানির গিরিপথ পাড়ি। যেতে লাগে আর্মি ক্যাম্পের অনুমতি, NID-র ২ কপি ফটোকপি ও বাধ্যতামূলক স্থানীয় গাইড। সেরা সময় নভেম্বর-এপ্রিল; এটি একদিনের ট্রিপ, রাতে থাকতে হয় বান্দরবান শহরে।

সূচিপত্র

দেবতাখুম আসলে কী — খুমের রাজা কেন

দেবতাখুম (Debotakhum) বান্দরবান (Bandarban) জেলার রোয়াংছড়ি (Rowangchhari) উপজেলায়, কচ্ছপতলী (Kachhaptali) বাজারের কাছে তারাছা খালের একটি অংশ। “খুম” মানে গভীর জলাধার বা ঝরনা-পরবর্তী শান্ত নদী-অববাহিকা; দেবতাখুম সেই খুমগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত। বান্দরবান শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার। দুই পাশে খাড়া পাথুরে পাহাড়, মাঝখানে গভীর নীল পানি — সূর্যের আলো ভেতরে ঠিকমতো পৌঁছায় না বলে খুমের ভেতরটা সবসময় ঠান্ডা, ছায়াঘেরা ও নিস্তব্ধ লাগে।

আকার নিয়ে দুই রকম তথ্য পাবেন। একাধিক ভ্রমণ লেখায় খুমের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০০ ফুট এবং গভীরতা ৫০-৭০ ফুট বলা হয়েছে; স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে কিছু জায়গা ৭০-৮০ ফুট পর্যন্ত গভীর। কোনো সরকারি জরিপের সংখ্যা প্রকাশ্যে মেলেনি, তাই গভীরতার সংখ্যাটিকে স্থানীয় ধারণা হিসেবেই ধরুন — আর এটাই কারণ, লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নামা এখানে সত্যিই ঝুঁকির। নামের পেছনে স্থানীয় বিশ্বাসও আছে: মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মানুষ এখানকার একটি পাথরকে দেবতার আসন মনে করেন, সেই “দেবতা” থেকেই দেবতাখুম। এই খুমকে তাই শুধু দেখার জায়গা নয়, শ্রদ্ধার জায়গা হিসেবেও দেখতে হয়।

অন্য খুমগুলোর তুলনায় দেবতাখুম জনপ্রিয় হওয়ার বড় কারণ সহজলভ্যতা। আমিয়াখুম (Amiakhum) বা ভেলাখুমে পৌঁছাতে যেখানে বহু ঘণ্টার কঠিন ট্রেক লাগে, দেবতাখুমে সেখানে কচ্ছপতলী থেকে তুলনামূলক কম হাঁটলেই পৌঁছানো যায়। প্রথমবার পাহাড়ি খুম দেখতে চাইলে, কিংবা পরিবার-বন্ধুদের নিয়ে একদিনের অ্যাডভেঞ্চার চাইলে, দেবতাখুমই বান্দরবানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত শুরু।

দেবতাখুমে কি কি দেখবেন

খুমের গিরিপথ ও নীল-সবুজ পানি: মূল আকর্ষণ খুমের ভেতরের সরু গিরিপথ। দুই পাশের উঁচু পাথরের দেওয়ালের মাঝ দিয়ে বাঁশের ভেলা বা ডিঙি নৌকায় এগিয়ে যাওয়ার সময় পানির রঙ বদলাতে থাকে — শীতকালে স্বচ্ছ নীল-সবুজ, বর্ষায় ঘোলাটে। পানির নিচে বড় বড় পাথর দেখা যায়, আর পাহাড়ের গায়ে গাছের শিকড় ঝুলে থাকে। ভেতরের দিকে যত যাবেন, আলো তত কমবে, শব্দ তত নিস্তব্ধ হবে — এই নীরবতাটাই দেবতাখুমের আসল অভিজ্ঞতা।

দেবতাখুমে বাঁশের ভেলায় পর্যটক
দেবতাখুমের গিরিপথে বাঁশের ভেলা — ছবি: Mahjuja Islam, Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0)

বাঁশের ভেলা ও ডিঙি নৌকা: খুমের ভেতরে চলাচলের একমাত্র উপায় ভেলা বা ছোট ডিঙি নৌকা। ভেলায় সাধারণত দুজন বসা যায়, নৌকায় কয়েকজন। ভেলাচালক স্থানীয়রাই — তারাই পাথরের ফাঁক গলে পথ চিনিয়ে নিয়ে যান। ভেলায় চড়ার সময় লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক, কারণ পানি অনেক গভীর। ভেলায় নিজে বৈঠা চালিয়ে ঘোরার চেষ্টা করবেন না; স্রোত ও পাথরের ফাঁক অচেনা মানুষের জন্য বিপজ্জনক।

দেবতার পাথর: খুমের ভেতরে স্থানীয় সম্প্রদায়ের পবিত্র স্থান — একটি বড় পাথর, যেখানে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। মাসের নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে এখানে বিশেষ উপাসনা হয়। এই পাথরে ওঠা, লাফ দেওয়া বা এর আশেপাশের পানিতে নামা সম্পূর্ণ নিষেধ। ছবি তোলার আগে স্থানীয়দের অনুমতি নেওয়াই ভদ্রতা।

শীলবান্ধা ঝরনা (Shilbandha Waterfall): খুমে যাওয়ার পথে শীলবান্ধা পাড়ার কাছে এই ঝরনাটি পড়ে। মূল খুম দেখার সঙ্গে বাড়তি সময় থাকলে গাইডকে আগেই বলুন — এ জন্য গাইড ফিতে আনুমানিক ৩০০ টাকা যোগ হয়। বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ঝরনার পানি সবচেয়ে ভালো থাকে, তবে পাথর পিচ্ছিল থাকে বলে সাবধানে হাঁটুন।

পং সু অং খুম ও শীলবান্ধা পাড়া: কচ্ছপতলী থেকে খুমের পথে প্রথমে পং সু অং খুমের মতো ছোট খুম পার হতে হয় — বর্ষায় এখানে পানি বেশি থাকলে গাছের শিকড় ধরে বা সাঁতরে পার হতে হয়, শুকনো মৌসুমে হেঁটেই পার হওয়া যায়। পথের মাঝে শীলবান্ধা পাড়া (স্থানীয় নাম লিরাগাঁও) — মারমা অধিবাসীদের গ্রাম, যেখানে জুম চাষ, পাহাড়ি লাউ আর তাজা কাজুবাদাম ফল দেখতে পাবেন। গ্রামের মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

দেবতাখুমের ভেতরের গিরিপথ ও নীল পানি
দেবতাখুমের ভেতরের গিরিপথ — ছবি: অভিজিৎ দাস, Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0)

কখন যাবেন — সেরা সময়

দেবতাখুম যাওয়ার সেরা সময় নভেম্বর থেকে এপ্রিল। এই সময় ঝিরিপথের পানি শান্ত ও স্বচ্ছ থাকে, ট্রেকের পথ শুকনো থাকে, আর খুমের ভেতরের নীল-সবুজ রঙ সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। শীতের সকালে পাহাড়ে হালকা কুয়াশা থাকতে পারে — ভোরে রওনা দিলে সেটাও একটা বাড়তি অভিজ্ঞতা।

বর্ষায় (জুন-অক্টোবর) যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়ি ঢলে পানি বেড়ে যায়, পথ পিচ্ছিল হয়, আর আচমকা বৃষ্টিতে ফ্ল্যাশ ফ্লাড হতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে টানা বৃষ্টি ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রোয়াংছড়ি প্রশাসন ১৮-২৫ জুন দেবতাখুমে প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছিল, আবহাওয়া ভালো হলে ২৬ জুন থেকে আবার খুলে দেয়। তাই বর্ষায় যাওয়ার আগে অবশ্যই স্থানীয় প্রশাসন বা গাইডের কাছ থেকে সেদিনের অবস্থা জেনে নিন — বর্ষার “খোলা আছে” মানেই নিরাপদ নয়। ঈদ বা লম্বা ছুটিতে ভিড় বেশি হয়; সেসময় গাইড ও গাড়ি আগেভাগে ঠিক করে রাখুন।

কিভাবে যাবেন — ধাপে ধাপে রুট

ধাপ ১ — বান্দরবান শহরে পৌঁছান: ঢাকা থেকে বান্দরবানের সরাসরি বাস চলে — সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল বা কলাবাগান থেকে শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক, সৌদিয়াসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস। নন-এসি ভাড়া আনুমানিক ৯০০ টাকা, এসি আনুমানিক ১,২০০-১,৮০০ টাকা (আসনভেদে)। ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে নতুন ব্রিজ/দামপাড়া/বহদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে বান্দরবানের বাস (আনুমানিক ২০০-৩০০ টাকা)। আগের রাতে বান্দরবান পৌঁছে থাকলে পরদিন ভোরে রওনা দেওয়া সহজ হয়।

ধাপ ২ — বান্দরবান শহর থেকে কচ্ছপতলী: রুট: বান্দরবান শহর → রোয়াংছড়ি (১৮ কিমি) → কচ্ছপতলী বাজার (আরও প্রায় ৭ কিমি)। সস্তা উপায়: শহরের রোয়াংছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোকাল বাস/যানবাহন (জনপ্রতি আনুমানিক ৬০ টাকা), তারপর রোয়াংছড়ি থেকে কচ্ছপতলী সিএনজি (আনুমানিক ১৫০-২০০ টাকা)। আরামদায়ক উপায়: শহর থেকে সরাসরি চাঁদের গাড়ি/জিপ বা সিএনজি রিজার্ভ — সিএনজি আপ-ডাউন আনুমানিক ২,০০০ টাকা, জিপ আনুমানিক ২,০০০-২,৫০০ টাকা (১২-১৩ জন বসা যায়)। গাড়ি কচ্ছপতলী বাজার পর্যন্তই যায়; এরপর হাঁটা পথ।

ধাপ ৩ — কচ্ছপতলী থেকে ট্রেক: বাজারে পৌঁছে প্রথমে অনুমতি ও গাইড ঠিক করুন (পরের অংশ দেখুন), দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে যান, তারপর ট্রেক শুরু। কচ্ছপতলী থেকে শীলবান্ধা পাড়া পর্যন্ত ঝিরিপথ ধরে হাঁটা — বিভিন্ন লেখায় ৪০ মিনিট থেকে ১.৫-২ ঘণ্টা বলা হয়েছে; দলের গতি ও পানির অবস্থার ওপর নির্ভর করে। পথে কয়েকবার ঝিরি পার হতে হয়। শীলবান্ধা পাড়া থেকে খুমের প্রবেশপথ আরও প্রায় ৩০ মিনিটের হাঁটা। ফেরার পথেও একই সময় ধরুন, আর সন্ধ্যার আগেই কচ্ছপতলী ফেরার পরিকল্পনা রাখুন।

দেবতাখুমের গভীর গিরিখাত ও নীল পানি
দেবতাখুমের গিরিখাত — ছবি: Mahjuja Islam, Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0)

অনুমতি ও গাইড — যা যা লাগবে

দেবতাখুমে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক, এবং অনুমোদিত স্থানীয় গাইড ছাড়া যাওয়া যায় না। কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে অনুমতি নিতে হয়। ধাপগুলো:

  1. কাগজপত্র: প্রত্যেকের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধনের ২ কপি ফটোকপি সঙ্গে নিন। কচ্ছপতলীতে ফটোকপির দোকান নেই বললেই চলে, তাই বাড়ি বা বান্দরবান শহর থেকেই করে নিন।
  2. ফর্ম ও ফি: ক্যাম্পে অনুমতি ফর্ম পূরণ করুন — ফি আনুমানিক ৫০ টাকা।
  3. গাইড বুকিং: কচ্ছপতলী বাজারের গাইড অফিস থেকে অনুমোদিত গাইড নিন। সারাদিনের গাইড ফি আনুমানিক ৫০০-১,০০০ টাকা (বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হার দেখা গেছে, তাই বুকিংয়ের সময়ই চূড়ান্ত করুন); একজন গাইড সর্বোচ্চ ১০ জনের দল নিতে পারেন। গাইডের দুপুরের খাবার কে দেবে, আগেই কথা বলে নিন।
  4. খুমের প্যাকেজ: খুমে প্রবেশ, ভেলা/নৌকা ও লাইফ জ্যাকেটসহ প্যাকেজ জনপ্রতি আনুমানিক ২০০ টাকা। শীলবান্ধা ঝরনা যোগ করলে গাইড ফিতে আনুমানিক ৩০০ টাকা বাড়ে।

এই লেখায় কোনো গাইডের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়নি — নম্বর বদলায়, আর যাচাই না করা নম্বরে আগাম টাকা পাঠানো ঝুঁকির। কচ্ছপতলী বাজারের গাইড অফিসে সরাসরি গিয়ে বুক করাই নিরাপদ।

দেবতাখুম ভ্রমণের খরচের হিসাব

নিচের সব খরচ আনুমানিক — মৌসুম, দলের আকার ও দরদামের ওপর বদলায়। ঢাকা থেকে একজন দলগত ভ্রমণকারীর একদিনের হিসাব এ রকম দাঁড়ায়:

খরচের খাতআনুমানিক খরচমন্তব্য
ঢাকা-বান্দরবান বাস (যাওয়া-আসা)১,৮০০-৩,৬০০ টাকানন-এসি/এসি ভেদে
বান্দরবান-কচ্ছপতলী গাড়ি (ভাগাভাগি)৩০০-৫০০ টাকা/জনসিএনজি/জিপ রিজার্ভ ভাগ করে
অনুমতি ফর্ম৫০ টাকাজনপ্রতি
গাইড ফি (ভাগাভাগি)৫০-১০০ টাকা/জন১০ জনের দলে ভাগ করলে
খুম প্যাকেজ (ভেলা/নৌকা + লাইফ জ্যাকেট)২০০ টাকাজনপ্রতি
খাবার (সকাল + দুপুর + পানি/শুকনো খাবার)৩০০-৫০০ টাকাকচ্ছপতলীতে দুপুরের প্যাকেজ আনুমানিক ২২০ টাকা
একদিনের মোট (ঢাকা থেকে, বাসসহ)আনুমানিক ২,৭০০-৫,০০০ টাকাথাকা-খাওয়া বাদে; বান্দরবানে রাত কাটালে হোটেল যোগ হবে

চট্টগ্রাম থেকে গেলে বাস ভাড়া অনেক কমে — সেক্ষেত্রে একদিনের ট্রিপ আনুমানিক ১,৫০০-২,০০০ টাকায়ও করা যায় বলে ভ্রমণকারীরা জানিয়েছেন। দল বড় হলে জনপ্রতি গাড়ি ও গাইড খরচ কমে, এটাই দেবতাখুমের বড় সুবিধা।

একদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা

সময়কাজ
সকাল ৬:৩০-৭:০০বান্দরবান শহর থেকে রিজার্ভ গাড়িতে রওনা; পথে নাশতা
সকাল ৮:০০-৮:৩০কচ্ছপতলী বাজার: অনুমতি, গাইড বুকিং, দুপুরের খাবারের অর্ডার
সকাল ৮:৩০-১০:৩০ট্রেক: কচ্ছপতলী → শীলবান্ধা পাড়া → খুমের প্রবেশপথ
সকাল ১০:৩০-১২:৩০ভেলায় খুমের গিরিপথ ঘোরা, দেবতার পাথর দেখা (শ্রদ্ধা রেখে)
দুপুর ১২:৩০-১:৩০ফেরার ট্রেক শুরু; চাইলে পথে শীলবান্ধা ঝরনা
দুপুর ২:০০-৩:০০কচ্ছপতলীতে অর্ডার করা গরম দুপুরের খাবার
বিকাল ৩:০০-৪:৩০কচ্ছপতলী থেকে বান্দরবান শহরে ফেরা

এই সময়সূচি শুকনো মৌসুমের জন্য। বর্ষায় ট্রেক ধীর হবে, তাই আরও ১-২ ঘণ্টা হাতে রাখুন। কোনো অবস্থাতেই অন্ধকারে পাহাড়ি পথে থাকবেন না — বিকালের মধ্যেই কচ্ছপতলী ফেরার লক্ষ্য রাখুন।

কোথায় থাকবেন

দেবতাখুমে রাত্রিযাপনের কোনো ব্যবস্থা নেই, আর খুমের এলাকায় বা শীলবান্ধা পাড়ায় ক্যাম্পিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই রাত কাটাতে হয় বান্দরবান শহরে। বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য শহরে সিঙ্গেল বেডের রুম আনুমানিক ৩৫০-৫০০ টাকা থেকে পাওয়া যায়; মাঝারি ও ভালো মানের হোটেল/রিসোর্টে এসি/নন-এসি ভেদে প্রতি রাত আনুমানিক ১,০০০-৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ছুটির দিন ও পিক সিজনে আগেভাগে বুকিং করা জরুরি — ঈদের ছুটিতে বান্দরবানের অনেক হোটেলই কয়েক দিন আগেই ভরে যায়। একদিনের ট্রিপের ক্ষেত্রে আগের রাত বান্দরবানে থেকে ভোরে রওনা দেওয়াই সেরা পরিকল্পনা।

কোথায় খাবেন

সকাল: বান্দরবান শহরে নাশতা সেরে রওনা দিন — শহরের বাজারে ভাত-ডাল-সবজি, পরোটা-ডিমসহ সাধারণ খাবার মেলে। দুপুর: কচ্ছপতলী বাজারে ট্রেক শুরুর আগেই স্থানীয় হোটেলে খাবারের অর্ডার দিয়ে যান; ফিরে এসে গরম খাবার পাবেন। বাজারের একটি জনপ্রিয় হোটেলে দেশি/বয়লার মুরগি, পাহাড়ি আলু ভর্তা, ডাল ও আনলিমিটেড ভাতের প্যাকেজ আনুমানিক ২২০ টাকায় পাওয়া যায় বলে ভ্রমণকারীরা জানিয়েছেন। পথে: খুমের আশেপাশে কোনো দোকান নেই — সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি, বিস্কুট, খেজুরের মতো শুকনো খাবার রাখুন। পথে মারমা/ত্রিপুরা পাড়ায় পাহাড়ি লাউ, জুমের ফসল ও তাজা কাজুবাদাম ফল চেখে দেখতে পারেন। ফিরে বান্দরবান শহরে রাতের খাবারের অনেক অপশন আছে।

দেবতাখুম বনাম বান্দরবানের অন্য খুম

বান্দরবানকে “খুমের রাজ্য” বলা হয়। কোন খুমে যাবেন, তা ঠিক করতে এই তুলনাটি কাজে লাগবে:

খুমকঠিনতাযেতে সময়কাদের জন্য
দেবতাখুমমাঝারিবান্দরবান থেকে একদিনপ্রথমবার খুম দেখতে চান যারা
আমিয়াখুমকঠিন২-৩ দিনের ট্রেকঅভিজ্ঞ ট্রেকার
নাফাখুমমাঝারি-কঠিন২ দিনঝরনা ও খুম দুটোই চান যারা
ভেলাখুমকঠিনআমিয়াখুম রুটের সঙ্গেআমিয়াখুম যাত্রার বাড়তি অংশ
সাতভাইখুমকঠিনথানচি রুটে বহুদিনের ট্রেকঅভিজ্ঞ দল

সহজ কথায়: সময় কম, প্রথমবার, পরিবারসহ — দেবতাখুম। আর বগালেক (Bogalake) বা তিন্দু (Tindu) ঘুরে এসে থাকলে পরের ধাপে আমিয়াখুম-ভেলাখুমের পরিকল্পনা করতে পারেন।

দেবতাখুমের ঝরনা ও পাথুরে পথ
দেবতাখুমের ঝরনা — ছবি: Mahjuja Islam, Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0)

টিপস ও সতর্কতা

  • কাগজপত্র: NID/জন্ম নিবন্ধনের ২ কপি ফটোকপি ছাড়া রওনা দেবেন না; কচ্ছপতলীতে ফটোকপির ব্যবস্থা নেই।
  • জুতো: ভালো গ্রিপের ট্র্যাকিং স্যান্ডেল বা বুট পরুন; খুমের শেষ প্রান্তের পিচ্ছিল পাথরে জুতো খুলে সাবধানে পা ফেলুন।
  • লাইফ জ্যাকেট: ভেলায় ওঠার আগে অবশ্যই পরুন — সাঁতার জানলেও। গভীরতা ও লুকানো পাথর দুটোই বিপজ্জনক।
  • মোবাইল নেটওয়ার্ক: কচ্ছপতলী পার হলে নেটওয়ার্ক প্রায় থাকে না (কচ্ছপতলীতে রবি/এয়ারটেল কিছুটা মেলে)। জরুরি যোগাযোগ আগেই সেরে নিন, অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড করে রাখুন।
  • পানি ও খাবার: কমপক্ষে ১.৫-২ লিটার পানি ও শুকনো খাবার সঙ্গে রাখুন; পথে পানির দোকান নেই।
  • ধর্মীয় শ্রদ্ধা: দেবতার পাথরে ওঠা, লাফানো ও আশেপাশে পানিতে নামা নিষেধ; স্থানীয়দের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
  • ক্যাম্পিং নিষেধ: খুমের এলাকায় বা শীলবান্ধা পাড়ায় তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানো যাবে না।
  • পরিবেশ: প্লাস্টিক বোতল, চিপসের প্যাকেট ঝিরিতে বা খুমে ফেলবেন না; যা নিয়ে যাবেন, ফিরিয়ে আনুন।
  • আবহাওয়া: বর্ষায় যাওয়ার দিন সকালে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিন — ভারী বৃষ্টি হলে ট্রিপ বাতিল করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
  • ফেরার সময়: সন্ধ্যার আগেই কচ্ছপতলী ফিরুন; অন্ধকারে পাহাড়ি পথে হাঁটা বিপজ্জনক।

আরও পড়ুন: দেবতাখুমের পুনরায় খোলা ও পর্যটকদের ভিড় নিয়ে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ভ্রমণ লেখা এবং আউটডোর অ্যাওয়েটসের বিস্তারিত গাইড।

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

দেবতাখুম কোথায় অবস্থিত?

দেবতাখুম বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলায়, কচ্ছপতলী বাজারের কাছে তারাছা খালের একটি অংশ। বান্দরবান শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার। কচ্ছপতলী থেকে ট্রেক করে শীলবান্ধা পাড়া হয়ে খুমে পৌঁছাতে হয়।

দেবতাখুম যেতে কি অনুমতি লাগে?

হ্যাঁ, লাগে। কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্পে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনের ২ কপি ফটোকপি জমা দিয়ে অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি ফর্মের ফি আনুমানিক ৫০ টাকা। অনুমোদিত স্থানীয় গাইড নেওয়াও বাধ্যতামূলক।

দেবতাখুম ভ্রমণের সেরা সময় কোনটি?

নভেম্বর থেকে এপ্রিল — এই সময় ঝিরির পানি শান্ত ও স্বচ্ছ থাকে, ট্রেক সহজ হয়। বর্ষায় পানি ঘোলা ও স্রোত বেশি থাকে, ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ঝুঁকি থাকে; ভারী বৃষ্টিতে প্রশাসন সাময়িকভাবে প্রবেশ বন্ধও করে দিতে পারে, যেমন ২০২৫ সালের জুনে কয়েক দিনের জন্য হয়েছিল।

দেবতাখুমে গাইড ও ভেলা/নৌকার খরচ কত?

সব খরচ আনুমানিক। সারাদিনের গাইড ফি আনুমানিক ৫০০-১,০০০ টাকা (একজন গাইড সর্বোচ্চ ১০ জনের দল নিতে পারেন); খুমে প্রবেশ, বাঁশের ভেলা বা ডিঙি নৌকা ও লাইফ জ্যাকেটসহ প্যাকেজ জনপ্রতি আনুমানিক ২০০ টাকা। শীলবান্ধা ঝরনা দেখতে চাইলে গাইড ফিতে আনুমানিক ৩০০ টাকা যোগ হয়।

দেবতাখুমে কি সাঁতার কাটা যায়?

না, সতর্ক থাকুন। স্থানীয়দের মতে খুমের কিছু অংশ ৫০-৮০ ফুট পর্যন্ত গভীর এবং পানির নিচে বড় পাথর আছে। লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নামা বিপজ্জনক, আর দেবতার পাথরের কাছে পানিতে নামা ও পাথরে ওঠা সম্পূর্ণ নিষেধ — এটি স্থানীয়দের পবিত্র স্থান।

দেবতাখুম কি একদিনে ঘুরে আসা যায়?

হ্যাঁ, এটাই স্বাভাবিক পরিকল্পনা। সকাল ৭টার মধ্যে বান্দরবান শহর থেকে রওনা দিলে দুপুরের মধ্যে খুম ঘুরে সন্ধ্যার আগেই শহরে ফেরা যায়। খুমে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা নেই এবং ক্যাম্পিং নিষিদ্ধ, তাই রাত কাটাতে হয় বান্দরবান শহরের হোটেলে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top