সেন্টমার্টিন যেতে হলে জাহাজই একমাত্র নিয়মিত ভরসা, আর বর্তমানে সেই জাহাজ ছাড়ে কক্সবাজার থেকে। টেকনাফ রুট বর্তমানে বন্ধ, তাই পুরোনো টেকনাফ-কেন্দ্রিক সময়সূচি দেখে পরিকল্পনা করলে ভুল হবে। এই পোস্টে কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন রুটের জাহাজ, ছাড়ার সময়, ঘাট আর শ্রেণিভিত্তিক ভাড়া এক জায়গায় দেওয়া হয়েছে — সঙ্গে টিকিট কাটার ধাপ আর ফেরার দিনের পরিকল্পনা। ভাড়া ও সময় মৌসুমভেদে বদলাতে পারে, তাই বুকিংয়ের আগে জাহাজ কোম্পানির অফিসিয়াল তথ্য যাচাই করে নেওয়াই নিরাপদ।
সূচিপত্র
- সেন্টমার্টিনে কোন কোন জাহাজ চলে
- কর্ণফুলী এক্সপ্রেস: সময়সূচি ও ঘাট
- কর্ণফুলী এক্সপ্রেস: শ্রেণিভিত্তিক ভাড়ার তালিকা
- চট্টগ্রাম রুট: এমভি বে ওয়ান
- টিকিট কাটার ধাপ
- জাহাজে ওঠার আগে যা জানা দরকার
- ফেরার দিনের পরিকল্পনা
- সতর্কতা: সময়সূচি ও ভাড়া বদলাতে পারে
- সাধারণ জিজ্ঞাসা
সেন্টমার্টিনে কোন কোন জাহাজ চলে
২০২৬ সালের বাস্তবতা হলো: সেন্টমার্টিনের নিয়মিত যাত্রীবাহী জাহাজ চলে কক্সবাজার থেকে, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। এই রুটের প্রধান জাহাজ এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস — বড়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্রুজ জাহাজ, যেখানে আসন ছাড়াও কেবিনের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে সেন্টমার্টিন রুটে এমভি বে ওয়ান নামের বিলাসবহুল জাহাজ সাপ্তাহিক ভিত্তিতে চলার কথা জানা যায়, তবে সেটি নিয়মিত দৈনিক সার্ভিস নয়। টেকনাফ থেকে আগে যেসব জাহাজ (যেমন কেয়ারি সিন্দাবাদ) চলত, সেই রুট বর্তমানে বন্ধ — তাই টেকনাফের পুরোনো ভাড়া বা সময় দেখে কেউ যেন পরিকল্পনা না করেন। মৌসুমের বাইরে (এপ্রিল–সেপ্টেম্বর) নিয়মিত জাহাজ থাকে না; তখন সমুদ্রও উত্তাল থাকে, তাই এই সময়ে দ্বীপ ভ্রমণ পরিকল্পনা না করাই ভালো।

কর্ণফুলী এক্সপ্রেস: সময়সূচি ও ঘাট
কর্ণফুলী এক্সপ্রেস কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে ছাড়ে — এই ঘাট কক্সবাজার বিমানবন্দরের পেছন দিকে, হোটেল-মোটেল এলাকা থেকে আনুমানিক ৫ কিলোমিটার দূরে, মেরিন ড্রাইভের পথে। জাহাজ সকাল ৭টার দিকে ছাড়ে আর বিকেল ৩টার দিকে সেন্টমার্টিন থেকে ফেরার যাত্রা শুরু করে। যাত্রার সময় আবহাওয়া ও সমুদ্রের অবস্থার উপর নির্ভর করে — হাতে আনুমানিক ৪–৫ ঘণ্টা ধরে পরিকল্পনা করা নিরাপদ, যদিও শান্ত সমুদ্রে সময় কমও লাগতে পারে। ঘাটে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা আগে পৌঁছানো উচিত, কারণ বোর্ডিং, রেজিস্ট্রেশন যাচাই আর আসন খুঁজতে সময় লাগে। মনে রাখবেন, দ্বীপে দৈনিক পর্যটক সংখ্যার সীমা থাকে (আনুমানিক ২,০০০ জন) আর ট্যুরিজম বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন লাগতে পারে — টিকিট থাকলেই হবে, এমনটা ধরে নেবেন না, বুকিংয়ের সময় রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
কর্ণফুলী এক্সপ্রেস: শ্রেণিভিত্তিক ভাড়ার তালিকা
কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের অফিসিয়াল ভাড়া (একমুখী / যাওয়া-আসা) নিচে দেওয়া হলো। এগুলো অফিসিয়াল সাইট থেকে পাওয়া তথ্য, তবে মৌসুমভেদে বদলাতে পারে:
| শ্রেণি | একমুখী (টাকা) | যাওয়া-আসা (টাকা) |
|---|---|---|
| ল্যাভেন্ডার / মেরিগোল্ড (ভিআইপি আসন) | ১,৮০০ | ৩,৫০০ |
| ওপেন ডেক | ২,১০০ | ৪,০০০ |
| গ্ল্যাডিওলাস (ভিআইপি আসন) | ২,৬০০ | ৫,০০০ |
| লিলাক লাউঞ্জ | ২,৭০০ | ৫,৩০০ |
| ক্রিসানথেমাম লাউঞ্জ | ২,৯০০ | ৫,৬০০ |
| একক কেবিন | ৩,৩০০ | ৬,৫০০ |
| টুইন কেবিন (২ জন) | ৭,০০০ | ১৩,০০০ |
| ভিআইপি কেবিন (২ জন) | ৮,৫০০ | ১৬,০০০ |
| ভিভিআইপি কেবিন (২ জন) | ১০,৫০০ | ২০,০০০ |
সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য ল্যাভেন্ডার/মেরিগোল্ড আসনই সবচেয়ে প্রচলিত — আরামদায়ক, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, আর দামও তুলনামূলক কম। ওপেন ডেকের মজা আলাদা: খোলা হাওয়ায় সমুদ্র দেখা যায়, তবে রোদ আর ঢেউয়ের ঝাপটা সরাসরি লাগে। পরিবার বা বেশি লাগেজ থাকলে কেবিন ভাবতে পারেন, তবে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। টিকিটের সঙ্গে সামনে-পেছনের ডেক ব্যবহার, রেস্টুরেন্ট আর নিরাপত্তা সরঞ্জামের সুবিধা থাকে।

চট্টগ্রাম রুট: এমভি বে ওয়ান
এমভি বে ওয়ান চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে সেন্টমার্টিন রুটে চলা বড় বিলাসবহুল জাহাজ। পুরোনো তথ্য অনুযায়ী এটি সাপ্তাহিক ভিত্তিতে চলত — বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে শুক্রবার সকালে দ্বীপে পৌঁছাত, আর শনিবার ফিরত। ভাড়াও প্রিমিয়াম স্তরের — পুরোনো তথ্য অনুযায়ী ইকোনমি আসনের একমুখী ভাড়া আনুমানিক ২,৮০০ টাকা থেকে শুরু হতো। তবে এই রুটের বর্তমান চালু অবস্থা, সূচি আর ভাড়া নিয়মিত বদলায়, তাই বে ওয়ানে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে যাত্রার আগে অবশ্যই অফিসিয়াল চ্যানেলে চালু আছে কিনা যাচাই করুন। বেশিরভাগ ভ্রমণকারীর জন্য কক্সবাজার রুটের কর্ণফুলী এক্সপ্রেসই সহজ আর নিশ্চিত বিকল্প।
টিকিট কাটার ধাপ
১) তারিখ ঠিক করুন — জাহাজ চলে অক্টোবর–মার্চ, পিক সিজন ডিসেম্বর–জানুয়ারি। ২) শ্রেণি বেছে নিন — বাজেট হলে ল্যাভেন্ডার/মেরিগোল্ড, দৃশ্য উপভোগ করতে চাইলে ওপেন ডেক। ৩) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা অনুমোদিত এজেন্টের মাধ্যমে টিকিট কাটুন; পিক সিজনে অন্তত ১–২ সপ্তাহ আগে কাটা নিরাপদ। ৪) ট্যুরিজম বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন লাগে কিনা, তা বুকিংয়ের সময় নিশ্চিত করুন — দৈনিক সীমা (আনুমানিক ২,০০০ জন) পূর্ণ হলে টিকিট থাকলেও যাত্রা আটকাতে পারে। ৫) যাওয়া-আসা দুটোই একসঙ্গে কাটলে ফেরার নিশ্চয়তা থাকে; শুধু যাওয়ার টিকিট কেটে দ্বীপে গিয়ে ফেরার টিকিট খোঁজা পিক সিজনে ঝুঁকিপূর্ণ। ৬) বুকিং কনফার্মেশন, জাতীয় পরিচয়পত্র আর টিকিটের কপি (প্রিন্ট/মোবাইল) সঙ্গে রাখুন।

জাহাজে ওঠার আগে যা জানা দরকার
ঘাটে যাওয়ার পথ: কক্সবাজার শহর/হোটেল এলাকা থেকে নুনিয়াছড়া ঘাটে যেতে স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করুন, হাতে পর্যাপ্ত সময় রাখুন। সি-সিকনেস থাকলে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ সঙ্গে রাখুন আর জাহাজের মাঝামাঝি, নিচের ডেকের আসন বেছে নিন — দোলা সেখানে কম লাগে। লাগেজ হালকা রাখুন; বড় স্যুটকেসের চেয়ে ব্যাকপ্যাক সুবিধাজনক। খাবার: জাহাজে রেস্টুরেন্ট থাকে, তবে দাম বেশি — হালকা শুকনো খাবার আর পানি সঙ্গে রাখতে পারেন। ক্যামেরা/মোবাইল চার্জ দিয়ে নিন, কারণ দীর্ঘ যাত্রায় চার্জিং পয়েন্ট সীমিত হতে পারে। আর সবচেয়ে জরুরি — আবহাওয়া খারাপ থাকলে জাহাজ বাতিল হতে পারে, তাই যাত্রার আগের দিন আবহাওয়া আর জাহাজ কোম্পানির নোটিশ দেখে নিন।

ফেরার দিনের পরিকল্পনা
ফেরার জাহাজ সেন্টমার্টিন থেকে বিকেল ৩টার দিকে ছাড়ে আর সন্ধ্যার দিকে কক্সবাজার পৌঁছায়। তাই ফেরার দিন ঢাকার রাতের বাস/ট্রেন ধরাই নিরাপদ — বিকেলের টিকিট রাখলে জাহাজ দেরি হলে মিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যারা কক্সবাজারে আরেক রাত থাকতে চান, তাদের জন্য সেটাই সবচেয়ে আরামদায়ক পরিকল্পনা। দ্বীপ ছাড়ার আগে হোটেলের বিল, রুমের চাবি আর জিনিসপত্র মিলিয়ে নিন; জেটিতে ভিড় হয়, তাই অন্তত ৪৫ মিনিট–১ ঘণ্টা আগে জেটিতে পৌঁছান। কক্সবাজার ফেরার পর ঢাকার ট্রেনের সময় ও ভাড়ার জন্য দেখুন: ঢাকা–কক্সবাজার ট্রেন সময়সূচি ও ভাড়া।
সতর্কতা: সময়সূচি ও ভাড়া বদলাতে পারে
এই পোস্টের সময় ও ভাড়া প্রকাশের সময়ের অফিসিয়াল তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া — জাহাজ কোম্পানি মৌসুম, জ্বালানি খরচ আর চাহিদা অনুযায়ী এগুলো বদলাতে পারে। বুকিংয়ের আগে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে চূড়ান্ত সময় ও ভাড়া মিলিয়ে নিন। দালাল বা অপরিচিত ফেসবুক পেজ থেকে টিকিট কিনবেন না — ভুয়া টিকিট আর অতিরিক্ত দামের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। টেকনাফ রুট বন্ধ থাকায় টেকনাফের কোনো জাহাজের টিকিট কিনতে গেলে সাবধান থাকুন। আরো সাধারণ তথ্যের জন্য দেখুন: সেন্টমার্টিন ভ্রমণ গাইড ও সেন্ট মার্টিন জাহাজ টিকিট।
অফিসিয়াল তথ্য: কর্ণফুলী এক্সপ্রেস অফিসিয়াল সাইট ও উইকিভয়েজ সেন্ট মার্টিন’স আইল্যান্ড গাইড।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সেন্টমার্টিনের জাহাজ কোথা থেকে ছাড়ে?
বর্তমানে জাহাজ ছাড়ে কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে। টেকনাফ রুট বর্তমানে বন্ধ, তাই টেকনাফ থেকে জাহাজের পরিকল্পনা করবেন না।
কর্ণফুলী এক্সপ্রেস কখন ছাড়ে?
কক্সবাজার থেকে সকাল ৭টার দিকে ছাড়ে আর সেন্টমার্টিন থেকে বিকেল ৩টার দিকে ফেরে। যাত্রার সময় আবহাওয়াভেদে বদলায়, তাই ঘাটে অন্তত ১ ঘণ্টা আগে পৌঁছান।
কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের সবচেয়ে কম ভাড়া কত?
সাধারণ ভিআইপি আসনের (ল্যাভেন্ডার/মেরিগোল্ড) একমুখী ভাড়া অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী ১,৮০০ টাকা, যাওয়া-আসা ৩,৫০০ টাকা। মৌসুমভেদে ভাড়া বদলাতে পারে।
সেন্টমার্টিন জাহাজ কোন মাসে চলে?
জাহাজ চলে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সমুদ্র সবচেয়ে শান্ত থাকে। এপ্রিল–সেপ্টেম্বর নিয়মিত জাহাজ থাকে না।
টিকিট কতদিন আগে কাটা উচিত?
পিক সিজনে (ডিসেম্বর–জানুয়ারি) অন্তত ১–২ সপ্তাহ আগে কাটা নিরাপদ। দৈনিক পর্যটক সীমা (আনুমানিক ২,০০০ জন) থাকায় শেষ মুহূর্তে টিকিট নাও মিলতে পারে।
জাহাজ বাতিল হলে কী করবেন?
আবহাওয়া খারাপ হলে জাহাজ বাতিল হতে পারে। তাই ফেরার দিন ঢাকার টিকিটে নমনীয়তা রাখুন আর জাহাজ কোম্পানির রিফান্ড/পরের দিনের ব্যবস্থা আগেভাগে জেনে রাখুন।
