সেন্টমার্টিন ভ্রমণের খরচ কত হবে — এই প্রশ্নের এক কথায় উত্তর হয় না, কারণ খরচটা নির্ভর করে আপনি কোন মৌসুমে যাচ্ছেন, কোন শ্রেণির জাহাজের টিকিট কাটছেন আর কেমন হোটেলে থাকছেন তার উপর। এই গাইডে ঢাকা থেকে শুরু করে দ্বীপে ফেরা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের খরচ আলাদা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আপনি নিজের বাজেট নিজেই সাজাতে পারেন। এখানে দেওয়া সব অঙ্ক আনুমানিক ও মৌসুমভেদে পরিবর্তনশীল — বুকিংয়ের সময় অবশ্যই যাচাই করে নেবেন।

সূচিপত্র

এক নজরে: সেন্টমার্টিন ভ্রমণের খরচ

একজন ভ্রমণকারীর জন্য ২ দিন ১ রাতের সেন্টমার্টিন ভ্রমণে মোটামুটি তিনটি স্তরের খরচ ধরা যায়। বাজেট ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ৮,০০০–১২,০০০ টাকা, মাঝারি মানে আনুমানিক ১৫,০০০–২৫,০০০ টাকা, আর আরামদায়ক বা প্রিমিয়াম ভ্রমণে আনুমানিক ৩০,০০০ টাকার বেশি লাগতে পারে। এই হিসাবে ঢাকা–কক্সবাজার যাতায়াত, জাহাজ ভাড়া, ১ রাতের থাকা, খাওয়া আর দ্বীপের ভেতরের ঘোরাঘুরি ধরা হয়েছে। ডিসেম্বর–জানুয়ারির পিক সিজনে হোটেল ও জাহাজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, তাই তখন খরচও উপরের দিকে থাকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলে শুধু অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। এই সময়ের বাইরে নিয়মিত জাহাজ বন্ধ থাকে, তাই বাজেট পরিকল্পনা এই মৌসুমের ভেতরেই করতে হবে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের সৈকত
সেন্টমার্টিন দ্বীপের সৈকত — ছবি: Tanvir Rahat, CC BY-SA 4.0

ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার খরচ

সেন্টমার্টিনের যাত্রা আসলে শুরু হয় কক্সবাজার থেকে, কারণ বর্তমানে দ্বীপের জাহাজ ছাড়ে কক্সবাজার থেকেই। তাই প্রথম খরচটা ঢাকা–কক্সবাজার পথের। ট্রেনে গেলে ঢাকা–কক্সবাজার রুটের ভাড়া শ্রেণিভেদে আনুমানিক ৭৫৪–২,৬৪৪ টাকা (একমুখী)। বাসে গেলে এসি/নন-এসি ভেদে জনপ্রতি আনুমানিক ৯০০–২,০০০ টাকা লাগতে পারে। জাহাজ ধরতে হলে আগের দিন কক্সবাজার পৌঁছে রাত থাকা নিরাপদ, কারণ জাহাজ সকাল ৭টার দিকে ছাড়ে। কক্সবাজারে ১ রাতের হোটেল খরচ আনুমানিক ১,৫০০–৫,০০০ টাকা (হোটেলের মানভেদে)। যারা রাতের বাসে গিয়ে ভোরে কক্সবাজার পৌঁছান, তারা এই রাতের খরচটা বাঁচাতে পারেন, তবে জাহাজ মিস হওয়ার ঝুঁকি মাথায় রাখতে হবে।

কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন জাহাজ ভাড়া

কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন রুটের প্রধান জাহাজ কর্ণফুলী এক্সপ্রেস। এর অফিসিয়াল ভাড়া অনুযায়ী সাধারণ আসনের একমুখী ভাড়া আনুমানিক ১,৮০০ টাকা থেকে শুরু, আর যাওয়া-আসা (রাউন্ড ট্রিপ) আনুমানিক ৩,৫০০ টাকা থেকে শুরু। ওপেন ডেকের রাউন্ড ট্রিপ আনুমানিক ৪,০০০ টাকা, আর লাউঞ্জ/ভিআইপি আসনের রাউন্ড ট্রিপ আনুমানিক ৫,০০০–৫,৬০০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। কেবিন নিলে খরচ অনেক বাড়ে — একক কেবিনের রাউন্ড ট্রিপ আনুমানিক ৬,৫০০ টাকা, টুইন কেবিন আনুমানিক ১৩,০০০ টাকা, আর ভিআইপি কেবিন আনুমানিক ১৬,০০০–২০,০০০ টাকা পর্যন্ত। টেকনাফ রুট বর্তমানে বন্ধ, তাই টেকনাফের পুরোনো কম ভাড়ার জাহাজের হিসাব এই বাজেটে ধরবেন না। পিক সিজনে টিকিট আগেভাগে কাটা ভালো, কারণ দৈনিক পর্যটক সংখ্যায় সীমা (আনুমানিক ২,০০০ জন) থাকে আর ট্যুরিজম বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন লাগতে পারে।

সেন্টমার্টিনের সৈকতে মাছ ধরার নৌকা
সেন্টমার্টিনের সৈকতে মাছ ধরার নৌকা — ছবি: TausifAlHossain, CC BY-SA 4.0

সেন্টমার্টিনে থাকার খরচ

দ্বীপে থাকার খরচ মৌসুমের উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে। সাধারণ বাজেট হোটেল/গেস্ট হাউসে ১ রাতের ভাড়া আনুমানিক ১,০০০–২,৫০০ টাকা। মাঝারি মানের রিসোর্টে আনুমানিক ২,৫০০–৬,০০০ টাকা, আর সৈকতমুখী প্রিমিয়াম রিসোর্টে আনুমানিক ৮,০০০ টাকার বেশি লাগতে পারে। শুক্রবার–শনিবার আর ডিসেম্বরের ছুটিতে ভাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, আর অনেক হোটেল তখন কমপক্ষে ২ রাতের বুকিং চায়। দ্বীপে বিদ্যুৎ জেনারেটর/সোলারনির্ভর, অনেক সময় রাত ১২টার পর সীমিত থাকে — দামি রিসোর্ট বেছে নেওয়ার সময় এই সুবিধাটা জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো। থাকার বিস্তারিত তালিকার জন্য দেখুন: সেন্ট মার্টিনের সেরা 10টি হোটেল ও রিসোর্ট।

খাওয়ার খরচ

দ্বীপে খাবারের দাম মূল ভূখণ্ডের চেয়ে কিছুটা বেশি, কারণ প্রায় সবকিছুই বাইরে থেকে আনতে হয়। স্থানীয় ছোট রেস্টুরেন্টে একবেলার সাধারণ খাবার (ভাত, মাছ/মাংস, ডাল) জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০–৩০০ টাকা। সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ দ্বীপের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার — মাছের আকার ও জাতভেদে জনপ্রতি আনুমানিক ৫০০–১,৫০০ টাকা বা তার বেশি লাগতে পারে। লবস্টার, কাঁকড়া আর বড় পমফ্রেটের দাম সবচেয়ে বেশি। ডাবের পানি আনুমানিক ৩০–৬০ টাকা। দিনে তিনবেলা খাবারের জন্য জনপ্রতি আনুমানিক ৭০০–১,৫০০ টাকা ধরে রাখা নিরাপদ। সকালে জেলেদের কাছ থেকে তাজা মাছ কিনে হোটেলের রান্নাঘরে রান্না করিয়ে নিলে অনেক সময় খরচ কমে।

ঘোরাঘুরি ও অ্যাকটিভিটির খরচ

দ্বীপের ভেতরে কোনো মোটরযান চলে না — হাঁটা আর ভ্যান/সাইকেলই ভরসা। সাইকেল ভাড়া আনুমানিক ৩০–৫০ টাকা প্রতি ঘণ্টা। ভ্যানে করে দ্বীপ ঘোরা দরদাম সাপেক্ষ, পুরো দ্বীপ ঘুরতে আনুমানিক ৩০০–৮০০ টাকা লাগতে পারে। ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়ার নৌকা ভাড়া জনপ্রতি আনুমানিক ২০০–৪০০ টাকা (দরদাম ও মৌসুমভেদে)। স্নরকেলিং সরঞ্জাম ভাড়া আনুমানিক ১৫০–৩০০ টাকা, আর গাইডসহ নৌকা ভ্রমণ আনুমানিক ৬০০–১,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সৈকতে সাঁতার, সূর্যোদয়–সূর্যাস্ত দেখা আর হেঁটে দ্বীপ ঘোরা — এগুলোতে কোনো খরচ নেই, আর এগুলোই সেন্টমার্টিনের আসল অভিজ্ঞতা। বিস্তারিত: ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণ গাইড।

সেন্টমার্টিন থেকে সমুদ্রের দৃশ্য
সেন্টমার্টিন থেকে সমুদ্রের দৃশ্য — ছবি: Syed07, CC BY-SA 4.0

নমুনা বাজেট: ২ দিন ১ রাত

একজন ভ্রমণকারীর জন্য ২ দিন ১ রাতের আনুমানিক হিসাব (ঢাকা থেকে, মাঝারি মানের ভ্রমণ): ঢাকা–কক্সবাজার যাতায়াত (বাস/ট্রেন, যাওয়া-আসা) আনুমানিক ২,০০০–৪,০০০ টাকা; কক্সবাজারে ১ রাত (যদি লাগে) আনুমানিক ১,৫০০–৩,০০০ টাকা; জাহাজ রাউন্ড ট্রিপ আনুমানিক ৩,৫০০–৫,০০০ টাকা; দ্বীপে ১ রাতের থাকা আনুমানিক ২,৫০০–৫,০০০ টাকা; খাওয়া ২ দিনে আনুমানিক ১,৫০০–৩,০০০ টাকা; দ্বীপের ঘোরাঘুরি ও স্নরকেলিং আনুমানিক ৫০০–১,৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ১১,৫০০–২১,৫০০ টাকা। দল বেঁধে গেলে হোটেল ও ভ্যানের খরচ ভাগাভাগি হয়, তাই জনপ্রতি খরচ কমে। আরো বিস্তারিত ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্য দেখুন: সেন্টমার্টিন ভ্রমণ গাইড।

খরচ কমানোর উপায়

প্রথমত, সপ্তাহের মাঝামাঝি (রবি–বৃহস্পতি) গেলে হোটেল ভাড়া কম পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, জাহাজের সাধারণ আসন আর ওপেন ডেকের চেয়ে লাউঞ্জ/কেবিন অনেক দামি — সমুদ্রের দৃশ্য ডেক থেকেই সবচেয়ে ভালো দেখা যায়, তাই সাধারণ আসনেই অভিজ্ঞতা কমে না। তৃতীয়ত, হোটেলের প্যাকেজের বদলে আলাদা করে জাহাজ টিকিট আর হোটেল বুক করলে অনেক সময় সস্তা পড়ে। চতুর্থত, দ্বীপে নগদ টাকা সঙ্গে রাখুন — এটিএম/কার্ডের সুবিধা সীমিত। পঞ্চমত, খাবারে বারবিকিউ একবেলা রেখে বাকি বেলা স্থানীয় খাবার খেলে খরচ অনেক কমে। ষষ্ঠত, গ্রুপে গেলে ভ্যান, নৌকা আর রুমের খরচ ভাগ হয়। সপ্তমত, অফ-পিক সময়ে (অক্টোবর বা মার্চের শুরু) গেলে ভিড়ও কম, দামও কম।

সেন্টমার্টিনের সৈকত
সেন্টমার্টিনের সৈকত — ছবি: ROCKY, CC BY-SA 4.0

সতর্কতা: যা আগে থেকে জানা দরকার

জাহাজের সময়সূচি ও ভাড়া মৌসুমভেদে বদলায় — এই গাইডের অঙ্কগুলো ধারণা দেওয়ার জন্য, চূড়ান্ত বুকিংয়ের আগে জাহাজ কোম্পানির অফিসিয়াল তথ্য যাচাই করুন। আবহাওয়া খারাপ হলে জাহাজ বাতিল হতে পারে, তাই ফেরার দিনে ঢাকার বাস/ট্রেনের টিকিটে কিছুটা নমনীয়তা রাখুন। দ্বীপে পর্যটক সংখ্যার দৈনিক সীমা থাকে (আনুমানিক ২,০০০ জন) আর ট্যুরিজম বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন লাগতে পারে — পিক সিজনে আগেভাগে ব্যবস্থা করুন। প্রবাল তোলা বা কেনা থেকে বিরত থাকুন; এটা দ্বীপের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর আর নিয়মবিরুদ্ধ হতে পারে। কক্সবাজার যাওয়ার ট্রেনের সময় ও ভাড়ার জন্য দেখুন: ঢাকা–কক্সবাজার ট্রেন সময়সূচি ও ভাড়া।

অফিসিয়াল তথ্য: কর্ণফুলী এক্সপ্রেস অফিসিয়াল সাইট ও উইকিভয়েজ সেন্ট মার্টিন’স আইল্যান্ড গাইড।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে জনপ্রতি কত খরচ হয়?

২ দিন ১ রাতের ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ৮,০০০–১২,০০০ টাকা (বাজেট), ১৫,০০০–২৫,০০০ টাকা (মাঝারি) বা ৩০,০০০ টাকার বেশি (প্রিমিয়াম) লাগতে পারে। মৌসুম, জাহাজের শ্রেণি আর হোটেলের মানের উপর চূড়ান্ত খরচ নির্ভর করে।

সেন্টমার্টিন জাহাজের রাউন্ড ট্রিপ ভাড়া কত?

কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের সাধারণ আসনের রাউন্ড ট্রিপ আনুমানিক ৩,৫০০ টাকা থেকে শুরু, ওপেন ডেক আনুমানিক ৪,০০০ টাকা, আর লাউঞ্জ/ভিআইপি আসন আনুমানিক ৫,০০০–৫,৬০০ টাকা পর্যন্ত। কেবিনের ভাড়া অনেক বেশি। ভাড়া মৌসুমভেদে বদলাতে পারে।

সেন্টমার্টিনে থাকার খরচ কেমন?

বাজেট হোটেলে ১ রাত আনুমানিক ১,০০০–২,৫০০ টাকা, মাঝারি রিসোর্টে আনুমানিক ২,৫০০–৬,০০০ টাকা, আর প্রিমিয়াম রিসোর্টে আনুমানিক ৮,০০০ টাকার বেশি লাগতে পারে। পিক সিজনে ভাড়া বেড়ে যায়।

সেন্টমার্টিনে খাবারের খরচ কত?

স্থানীয় রেস্টুরেন্টে একবেলা আনুমানিক ১৫০–৩০০ টাকা। সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ মাছভেদে জনপ্রতি আনুমানিক ৫০০–১,৫০০ টাকা বা বেশি। দিনে তিনবেলা আনুমানিক ৭০০–১,৫০০ টাকা ধরে রাখুন।

সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সেরা সময় কখন?

জাহাজ চলে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সমুদ্র শান্ত আর আবহাওয়া ভালো থাকে, তাই এটাই সেরা সময়। তবে এই সময় ভিড় আর দাম দুটোই বেশি।

সেন্টমার্টিনে কি কার্ড/এটিএম চলে?

দ্বীপে এটিএম আর কার্ড পেমেন্টের সুবিধা সীমিত। তাই পর্যাপ্ত নগদ টাকা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া নিরাপদ। হোটেল আর জাহাজের বড় পেমেন্ট আগেভাগে সেরে রাখুন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top