ঢাকার বুকে এক টুকরো সবুজের নাম চন্দ্রিমা উদ্যান। শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের পাশঘেঁষা এই উদ্যান একসময় জিয়া উদ্যান নামে পরিচিত ছিল; এখনো অনেকের মুখে দুটো নামই শোনা যায়। ভোরের হাঁটা থেকে বিকেলের আড্ডা — ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এই পার্কের সম্পর্কটা বেশ পুরনো। কংক্রিটের এই শহরে যেখানে খোলা আকাশ আর নির্মল বাতাসের দেখা পাওয়া কঠিন, সেখানে চন্দ্রিমা উদ্যান যেন শহরের ফুসফুস — একটুখানি প্রশান্তির খোঁজে প্রতিদিন এখানে ভিড় জমান হাজারো মানুষ।

চন্দ্রিমা উদ্যান ঢাকা
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (NahidSultan, CC BY-SA 3.0)

সকালটা যেখানে শুরু হয় পাখির ডাকে

ভোরের আলো ফোটার আগেই উদ্যানের ফটকে জমতে থাকে ভিড়। ট্র্যাকসুট পরা তরুণ থেকে অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ — সবাই আসেন সকালের হাঁটার টানে। উদ্যানের ভেতরের পাকা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে গায়ে লাগে ঠান্ডা বাতাস, কানে আসে পাখির কিচিরমিচির। শহরের ধুলো-ধোঁয়া আর হর্নের শব্দ থেকে দূরে এই কয়েকটা ঘণ্টা অনেকের কাছেই দিনের সেরা উপহার। কেউ দল বেঁধে হাঁটেন, কেউ একা একা — যার যার মতো করে সকালটা উপভোগ করেন সবাই।

নিয়মিত যারা আসেন, তাদের অনেকের কাছে চন্দ্রিমা উদ্যান শুধু ব্যায়ামের জায়গা নয়, সামাজিক আড্ডার ঠিকানাও। হাঁটা শেষে গাছের ছায়ায় বসে চায়ের কাপে চুমুক, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব — উদ্যানের সকাল মানেই এমন প্রাণবন্ত দৃশ্য। নতুন যারা আসতে চান, তাদের জন্য সকাল 6টা থেকে 8টার সময়টা সবচেয়ে উপযুক্ত।

লেকের পাড়ে অলস দুপুর

উদ্যানের মাঝ বরাবর রয়েছে শান্ত একটি লেক। লেকের পাড়ে বসে থাকতে থাকতে কখন যে সময় পেরিয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। পানিতে ভাসে হাঁসের দল, পাড়ে খেলা করে শিশুরা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই ভিড় বাড়তে থাকে — কেউ আসেন বন্ধুদের নিয়ে, কেউ পরিবার নিয়ে পিকনিকের আমেজে। লেকের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া সেতুতে দাঁড়িয়ে চারপাশের সবুজ দেখার মজাই আলাদা।

চন্দ্রিমা উদ্যানের সবুজ
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Hopeoflight, CC BY-SA 4.0)

ফটোগ্রাফারদের কাছেও এই জায়গার আলাদা কদর আছে। ভোরের হালকা কুয়াশা, লেকের পানিতে গাছের প্রতিবিম্ব কিংবা পড়ন্ত বিকেলের সোনালি আলো — ক্যামেরাবন্দি করার মতো দৃশ্যের অভাব নেই এখানে। সপ্তাহান্তে অনেকেই শুধু ছবি তোলার জন্যই চলে আসেন উদ্যানে।

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

চন্দ্রিমা উদ্যান শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসও। এখানেই রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিসৌধ। প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। উদ্যানের এই অংশের পরিবেশটা একটু গম্ভীর — ইতিহাস যেন নীরবে কথা বলে। উইকিপিডিয়ায় জিয়া উদ্যান সম্পর্কে আরও পড়ুন।

পরিবার নিয়ে কাটুক একটি দিন

শিশুদের জন্য খোলা মাঠ, বড়দের জন্য বসার বেঞ্চ আর চারপাশে সবুজ — পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য চন্দ্রিমা উদ্যানের চেয়ে ভালো জায়গা ঢাকায় কমই আছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অনেকে বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসেন, গাছের ছায়ায় বসে দুপুরের খাওয়া সারেন। খরচ প্রায় শূন্য, আনন্দ ভরপুর — এই হিসাবেই জায়গাটি সাধারণ পরিবারের কাছে এত প্রিয়। শিশুরা মাঠে দৌড়ঝাঁপ করে, বয়স্করা বেঞ্চে বসে গল্প করেন — সবার জন্যই কিছু না কিছু আছে এখানে।

তবে মনে রাখবেন, উদ্যানটি পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। ময়লা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন, গাছের ডাল ভাঙবেন না, লেকে কিছু ফেলবেন না।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে শেরেবাংলা নগর বা সংসদ ভবন এলাকা বললেই রিকশা, সিএনজি বা বাসচালক চিনবেন। মিরপুর রোড ও মানিক মিয়া এভিনিউ ধরে সহজেই পৌঁছানো যায়; ফার্মগেট থেকেও দূরত্ব খুব বেশি নয়। গুগল ম্যাপে চন্দ্রিমা উদ্যানের অবস্থান দেখুন।

এক নজরে ভ্রমণ তথ্য

বিষয় তথ্য
অবস্থান শেরেবাংলা নগর, ঢাকা (জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে)
খোলার সময় প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত
প্রবেশ ফি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ফি নেই
যাওয়ার সেরা সময় সকাল 6টা–8টা ও বিকেল 4টা–6টা
যা পাবেন হাঁটার পথ, লেক ও সেতু, বসার বেঞ্চ, সবুজ চত্বর

ভ্রমণের আগে মনে রাখুন

সকালে গেলে সঙ্গে পানির বোতল রাখুন, আর ছবি তুলতে চাইলে বিকেলের নরম আলো সবচেয়ে ভালো। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে উদ্যানে ভিড় বেশি হয়, তাই নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে কর্মদিবসে যাওয়াই ভালো। সঙ্গে ছোট শিশু থাকলে লেকের পাড়ে খেয়াল রাখুন।

আশেপাশে ঘোরার মতো জায়গা

চন্দ্রিমা উদ্যান ঘোরা শেষে চাইলে ঢাকার আরও কিছু জায়গা ঘুরে আসতে পারেন। নদী আর পুরনো ঢাকার আমেজ পেতে ঘুরে আসুন ঢাকা সদরঘাট থেকে, শহরের আধুনিক মুখ দেখতে যেতে পারেন দিয়াবাড়ি, আর স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেখে আসুন মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ।

যোগাযোগ

ঠিকানা: চন্দ্রিমা উদ্যান, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।
জাতীয় জরুরি সেবা: 999

চন্দ্রিমা উদ্যান কোথায় অবস্থিত?

চন্দ্রিমা উদ্যান ঢাকার শেরেবাংলা নগরে, জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে অবস্থিত।

চন্দ্রিমা উদ্যানে কী কী দেখার আছে?

উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিসৌধ। এ ছাড়া ক্রিসেন্ট লেকের ওপর সেতু, সবুজ মাঠ, ছায়াঘেরা হাঁটার পথ ও মসজিদ রয়েছে।

চন্দ্রিমা উদ্যানে প্রবেশ ফি আছে কি?

চন্দ্রিমা উদ্যান সবার জন্য উন্মুক্ত; সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশে আলাদা টিকিটের প্রয়োজন হয় না।

চন্দ্রিমা উদ্যান ভ্রমণের সেরা সময় কোনটি?

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো। দিনের মধ্যে সকাল ও বিকেলের দিকটা সবচেয়ে উপভোগ্য।

চন্দ্রিমা উদ্যানে কিভাবে যাবো?

ফার্মগেট বা খামারবাড়ি হয়ে বাসে, অথবা ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে সিএনজি, রিকশা বা ব্যক্তিগত গাড়িতে সহজেই যাওয়া যায়।

চন্দ্রিমা উদ্যানের ঠিকানা কী?

ঠিকানা: চন্দ্রিমা উদ্যান, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-1207।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top