মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর (Mujibnagar) এমন একটি জায়গা, যেখানে দাঁড়ালে বাংলাদেশের জন্মের মুহূর্তটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এই গ্রামের আম্রকাননে শপথ নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। সেই শপথস্থানকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স — ২০.১০ একর জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর, ভাস্কর্য, মানচিত্র আর ঐতিহাসিক আমবাগান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কাছ থেকে জানতে চাইলে বাংলাদেশে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য খুব কমই আছে।
সংক্ষেপে
- মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স, বৈদ্যনাথতলা, মুজিবনগর উপজেলা, মেহেরপুর — মেহেরপুর শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে।
- ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এখানে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ; জায়গার পুরোনো নাম বৈদ্যনাথতলা।
- দেখার মতো: ২৩ স্তম্ভের স্মৃতিসৌধ, লাল ইটের শপথস্থান, ১১ সেক্টরের মানচিত্র, আম্রকানন, ছয় দফার গোলাপ বাগান, ভাস্কর্য ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
- ঢাকা থেকে মেহেরপুর বাস ভাড়া আনুমানিক ৬০০–১৩০০ টাকা; মেহেরপুর শহর থেকে কমপ্লেক্স পর্যন্ত স্থানীয় যানবাহনে প্রায় ৩০ মিনিট।
- ঘুরতে সময় লাগে ২–৩ ঘণ্টা; সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, আর ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে থাকে বিশেষ আয়োজন।
সূচিপত্র
- মুজিবনগর কেন ইতিহাসের মোড় ঘোরানো জায়গা
- স্মৃতিসৌধের ২৩টি স্তম্ভ ও স্থাপত্য
- কমপ্লেক্সে যা যা দেখবেন
- কিভাবে যাবেন
- কখন যাবেন ও কত সময় লাগবে
- কোথায় থাকবেন
- কোথায় খাবেন
- কাছাকাছি আরও যা দেখতে পারেন
- ভ্রমণ খরচের আনুমানিক হিসাব
- টিপস ও সতর্কতা
- প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
মুজিবনগর কেন ইতিহাসের মোড় ঘোরানো জায়গা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান শুরু হলে বাঙালি নেতৃত্ব সীমান্ত পেরিয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার, আর ১৭ এপ্রিল সেই সরকারের শপথের জন্য বেছে নেওয়া হয় মেহেরপুরের সীমান্তঘেঁষা বৈদ্যনাথতলা গ্রামের একটি আমবাগান — বাংলাদেশের মাটিতে, তখনকার কুষ্টিয়া জেলার (বর্তমানে মেহেরপুর জেলা) ভেতরে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আবদুল মান্নান, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক মুহম্মদ ইউসুফ আলী। ঘোষণাপত্রটির খসড়া করেছিলেন ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম।
শপথ নেওয়া মন্ত্রিসভার চেহারাটা ছিল এমন: রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (তখন পাকিস্তানে বন্দি), তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী। অনুষ্ঠানে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তাজউদ্দীন আহমদ জায়গাটির নাম দেন মুজিবনগর — বঙ্গবন্ধুর নামে। এরপর থেকে এই সরকারই পরিচিত হয় মুজিবনগর সরকার নামে। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় শপথের পরপরই সবাই জায়গাটি ছেড়ে যান, কিন্তু সেদিনের সিদ্ধান্তই মুক্তিযুদ্ধকে একটি বৈধ সরকারের নেতৃত্ব দেয়।
স্বাধীনতার পরপরই এই জায়গাকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের ৩১ আগস্ট স্মৃতিসৌধ নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়, ১৯৭৪ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। ১৯৭৫ সালের পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়, ১৯৮৬ সালে আবার শুরু হয় এবং ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে অতিথিশালা, মসজিদ ও লাইব্রেরি যুক্ত হয়ে এটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি কমপ্লেক্সের রূপ পায়।
স্মৃতিসৌধের ২৩টি স্তম্ভ ও স্থাপত্য
কমপ্লেক্সের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, যার নকশা করেছেন স্থপতি তানভীর নকীব। সৌধটি দাঁড়িয়ে আছে ২৩টি ত্রিভুজাকৃতি কংক্রিট স্তম্ভের ওপর। এই ২৩টি স্তম্ভ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসনের ২৩ বছর এবং সেই সময়জুড়ে বাঙালির ধারাবাহিক সংগ্রামের প্রতীক। স্তম্ভগুলোর বিন্যাসে উদীয়মান সূর্যের আভাস ফুটে ওঠে, আর সেগুলো বেদির অর্ধেক অংশ ঢেকে রাখে।
স্মৃতিসৌধের সামনে লাল ইট দিয়ে চিহ্নিত করা আছে সেই নির্দিষ্ট জায়গাটি, যেখানে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নিয়েছিলেন। এই লাল ইটের চত্বরটিই কমপ্লেক্সের সবচেয়ে আবেগঘন স্থান — দর্শনার্থীরা এখানে দাঁড়িয়ে সেই দিনের কথা স্মরণ করেন। সৌধের গায়ে ও চারপাশে মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনার ম্যুরাল আঁকা আছে, যা পুরো চত্বরকে একটি খোলা আকাশের নিচের জাদুঘরের মতো করে তুলেছে।

কমপ্লেক্সে যা যা দেখবেন
স্মৃতিসৌধ ও শপথস্থান: ২৩ স্তম্ভের স্মৃতিসৌধ এবং লাল ইটে চিহ্নিত শপথস্থান কমপ্লেক্সের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকে ঘোরা শুরু করলে পুরো জায়গার ইতিহাসটা মাথায় গেঁথে যায়। সৌধের চারপাশের খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য সকালের নরম আলো সবচেয়ে ভালো।
১১ সেক্টরের মানচিত্র: কমপ্লেক্সের আঙিনায় বড় আকারের মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে উপস্থাপন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়েছিল — এই মানচিত্র দেখলে বোঝা যায় কোন সেক্টর কোথায় ছিল এবং যুদ্ধটা কতটা ছড়িয়ে ছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ইতিহাস বোঝার একটি কার্যকর উপায়।
ঐতিহাসিক আম্রকানন: শপথ অনুষ্ঠান যে আমবাগানে হয়েছিল, সেই আম্রকানন এখনো কমপ্লেক্সের অংশ। গাছের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে ভালো লাগে — এখানেই একদিন একটি জাতির ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছিল। প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে এই আম্রকাননেই জাতীয় পতাকা উত্তোলন, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও কুচকাওয়াজের আয়োজন হয়।
ছয় দফার গোলাপ বাগান: বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফার রূপক উপস্থাপনা হিসেবে কমপ্লেক্সে একটি গোলাপ বাগান সাজানো আছে। ছয় দফা ছিল বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিনামা, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। বাগানটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর প্রতীকী অর্থটাও মনে রাখার মতো।
মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য: কমপ্লেক্সের ভেতরে ও বাইরে ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নানা মুহূর্ত — বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য। ভাস্কর্যগুলো ইতিহাসকে শুধু পড়ার বিষয় না রেখে চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর ও ম্যুরাল: কমপ্লেক্সের জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের নানা নিদর্শন, ছবি ও দলিলপত্র দেখা যায়। দেয়ালে দেয়ালে আঁকা ম্যুরালে উঠে এসেছে যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা। যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গভীরভাবে জানতে চান, তাদের জন্য জাদুঘর অংশটি অবশ্যই দেখা উচিত।
মসজিদ, লাইব্রেরি ও অতিথিশালা: ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে কমপ্লেক্সে যুক্ত হয় মসজিদ, লাইব্রেরি ও অতিথিশালা। লাইব্রেরিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইপত্র পাওয়া যায়, আর সবুজ চত্বর ও বাগান মিলিয়ে পুরো কমপ্লেক্সটি ঘণ্টা দুয়েক সময় কাটানোর মতো শান্ত একটি জায়গা।
কিভাবে যাবেন
মুজিবনগর যেতে হলে প্রথমে মেহেরপুর শহরে পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে মেহেরপুর যাওয়ার দুটি প্রধান রুট আছে — পদ্মা সেতু হয়ে এবং বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে। পদ্মা সেতু হয়ে গাবতলী থেকে ছাড়ে জে আর, রয়েল, এস এম, মেহেরপুর ডিলাক্স ও চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাস। আর বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে কল্যাণপুর থেকে ছাড়ে এস বি পরিবহন, জে আর, শ্যামলী ও আর কে পরিবহনের এসি ও নন-এসি বাস। বাসভেদে টিকিটের দাম আনুমানিক ৬০০ থেকে ১৩০০ টাকা। ঢাকা থেকে মেহেরপুর পৌঁছাতে সময় লাগে আনুমানিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা।
মেহেরপুর শহর থেকে মুজিবনগর কমপ্লেক্সের দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার। বাস, টেম্পু, নছিমন বা করিমনের মতো স্থানীয় যানবাহনে যেতে সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট। শহর থেকে রিজার্ভ অটোরিকশা বা সিএনজি নিলে নিজের সময়মতো যাওয়া-আসা করা যায়। যারা কুষ্টিয়া বা চুয়াডাঙ্গা থেকে আসবেন, তারাও সড়কপথে মেহেরপুর হয়ে সহজেই মুজিবনগর পৌঁছাতে পারবেন।
| রুট | যানবাহন | আনুমানিক খরচ ও সময় |
|---|---|---|
| ঢাকা (গাবতলী) → মেহেরপুর | জে আর, রয়েল, এস এম, মেহেরপুর ডিলাক্স, চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স (পদ্মা সেতু হয়ে) | ৬০০–১৩০০ টাকা; ৭–৮ ঘণ্টা |
| ঢাকা (কল্যাণপুর) → মেহেরপুর | এস বি পরিবহন, জে আর, শ্যামলী, আর কে পরিবহন (এসি/নন-এসি) | ৬০০–১৩০০ টাকা; ৭–৮ ঘণ্টা |
| মেহেরপুর শহর → মুজিবনগর | বাস, টেম্পু, নছিমন, করিমন, রিজার্ভ অটোরিকশা | আনুমানিক ৩০ মিনিট; ১৮ কিলোমিটার |
টিকিটের দাম ও সময়সূচি সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের কাউন্টার থেকে বর্তমান তথ্য যাচাই করে নিন। সকালের বাস ধরলে দুপুরের আগেই মেহেরপুর পৌঁছে বিকেলের মধ্যে কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা যায়।
কখন যাবেন ও কত সময় লাগবে
মুজিবনগর ঘোরার সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, যখন আবহাওয়া ঠান্ডা ও আরামদায়ক থাকে এবং খোলা চত্বরে হাঁটতে কষ্ট হয় না। গরমের সময় দুপুরের রোদ এড়িয়ে সকাল বা বিকেলে ঘোরা ভালো। কমপ্লেক্স ঘুরতে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় রাখুন — স্মৃতিসৌধ, মানচিত্র, আম্রকানন, গোলাপ বাগান, ভাস্কর্য ও জাদুঘর ধীরে ধীরে দেখতে এটুকু সময় লাগেই।
বিশেষ একটি দিন হলো ১৭ এপ্রিল, মুজিবনগর দিবস। সেদিন কমপ্লেক্সে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, পুষ্পস্তবক অর্পণ, কুচকাওয়াজ ও নানা আয়োজন হয়, আর সারাদেশ থেকে দর্শনার্থী আসেন। এই দিনের আবহটা অন্যরকম, তবে ভিড়ও বেশি থাকে — তাই সকালে পৌঁছানো ভালো। আর আমের মৌসুমে (মে–জুন) মেহেরপুর গেলে পাকা আমের স্বাদ নেওয়ার সুযোগটাও মিলে যায়।
কোথায় থাকবেন
মুজিবনগর কমপ্লেক্সের কাছে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের একটি আবাসিক হোটেল আছে বলে বিভিন্ন ভ্রমণ নির্দেশিকায় উল্লেখ আছে। এছাড়া মেহেরপুর শহরে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, সার্কিট হাউজ, পৌর হল ও ফিন টাওয়ারসহ বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। শহরের সাধারণ হোটেলগুলোতে রাতের ভাড়া আনুমানিক ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে থাকে, মান ও সুবিধাভেদে। ডাকবাংলো বা সার্কিট হাউজে থাকতে চাইলে আগে থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অনুমতি নিতে হয়।
যারা ঢাকা থেকে আসছেন, তাদের জন্য মেহেরপুরে এক রাত থাকা সবচেয়ে আরামদায়ক পরিকল্পনা। সকালে কমপ্লেক্স ঘুরে বিকেলে আমঝুপি নীলকুঠি দেখে সন্ধ্যায় শহরে ফেরা যায়। আর যারা কুষ্টিয়া বা চুয়াডাঙ্গায় থাকছেন, তারা সেখান থেকেও দিনের ভ্রমণ হিসেবে মুজিবনগর ঘুরে আসতে পারেন।
কোথায় খাবেন
কমপ্লেক্স চত্বরে বড় রেস্টুরেন্ট নেই, তাই খাওয়ার ব্যবস্থা মূলত মেহেরপুর শহরে। শহরের হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতে ভাত, মাছ, মাংসসহ সাধারণ বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। মেহেরপুরে গেলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত “সাবিত্রী” মিষ্টির স্বাদ নেওয়ার কথা অনেক ভ্রমণ নির্দেশিকায় বলা হয়। আর আমের মৌসুমে গেলে মেহেরপুরের পাকা আম খেতে ভুলবেন না — এই অঞ্চলের আমের সুনাম আছে।
কমপ্লেক্স ঘোরার সময় সঙ্গে পানির বোতল ও হালকা শুকনো খাবার রাখা ভালো, বিশেষ করে গরমের দিনে। শিশু ও বয়স্কদের সঙ্গে থাকলে ছায়াযুক্ত জায়গায় বসে বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা আছে, তবে দুপুরের খাবারের জন্য শহরে ফেরাই সুবিধাজনক।
কাছাকাছি আরও যা দেখতে পারেন
মুজিবনগর ঘোরার সঙ্গে মেহেরপুরের আরেকটি ঐতিহাসিক জায়গা যোগ করা যায় — আমঝুপি নীলকুঠি। ব্রিটিশ আমলে নীল চাষের জন্য তৈরি এই কুঠি মেহেরপুর শহরের কাছে আমঝুপিতে অবস্থিত, আর এটি এই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সাক্ষী। মুজিবনগর থেকে ফেরার পথে বা পরের দিন সকালে নীলকুঠি দেখে নিলে মেহেরপুর ভ্রমণটি আরও পূর্ণ হয়। এছাড়া মেহেরপুর শহরের বাজার ও পৌর এলাকায় ঘুরে স্থানীয় জীবনযাত্রার স্বাদ নেওয়া যায়।
ভ্রমণ খরচের আনুমানিক হিসাব
একজন ভ্রমণকারীর জন্য মেহেরপুর–মুজিবনগর ভ্রমণের আনুমানিক খরচ নিচের মতো হতে পারে। সব অঙ্কই আনুমানিক এবং সময় ও মানভেদে বদলাতে পারে।
| খাত | আনুমানিক খরচ (জনপ্রতি) |
|---|---|
| ঢাকা → মেহেরপুর বাস (যাওয়া-আসা) | ১২০০–২৬০০ টাকা |
| মেহেরপুর শহর → মুজিবনগর যাওয়া-আসা | ১০০–৩০০ টাকা |
| মেহেরপুরে এক রাতের হোটেল | ৮০০–২৫০০ টাকা |
| খাওয়া (দিনপ্রতি) | ৪০০–৮০০ টাকা |
| কমপ্লেক্স প্রবেশ | সাধারণত ফি নেই (যাচাই সাপেক্ষে) |
টিপস ও সতর্কতা
- সকালে কমপ্লেক্সে পৌঁছান — আলো ভালো থাকে, ভিড় কম থাকে, আর গরমও কম লাগে।
- এটি একটি জাতীয় স্মৃতিস্থান, তাই শালীন আচরণ করুন; স্মৃতিসৌধ ও শপথস্থানে হইচই বা অশোভন আচরণ এড়িয়ে চলুন।
- জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার নিয়ম থাকতে পারে — ভেতরে ঢোকার আগে নিয়ম জেনে নিন।
- মেহেরপুর শহর থেকে নগদ টাকা তুলে নিন; মুজিবনগর এলাকায় এটিএম বা ব্যাংকের সুবিধা সীমিত।
- ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে গেলে আগেভাগে পৌঁছান এবং ভিড়ের কথা মাথায় রেখে সময় হাতে রাখুন।
- বাসের টিকিট, হোটেল ভাড়া ও খোলার সময় যাত্রার আগে যাচাই করুন — এগুলো সময়ের সঙ্গে বদলায়।
- সঙ্গে পানি, ছাতা বা টুপি আর আরামদায়ক জুতা রাখুন; কমপ্লেক্সটি খোলা চত্বর, অনেকটা পথ হাঁটতে হয়।
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয় — এটি বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির জন্মের সাক্ষী। যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বইয়ের পাতার বাইরে, মাটিতে দাঁড়িয়ে অনুভব করতে চান, তাদের ভ্রমণ তালিকায় এই জায়গাটি থাকা উচিত। আরও ঐতিহাসিক গন্তব্যের জন্য দেখুন লালন শাহের মাজার, কুষ্টিয়া, উত্তরা গণভবন, নাটোর এবং ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, কুমিল্লা। ইতিহাসের বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন উইকিপিডিয়ার মুজিবনগর মেমোরিয়াল নিবন্ধ, ট্যুরিস্ট প্লেসেসের মুজিবনগর পরিচিতি এবং স্মৃতিসৌধ নিয়ে ভয়েস সেভেন নিউজের প্রতিবেদন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স কোথায় অবস্থিত?
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে অবস্থিত। মেহেরপুর শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার, স্থানীয় যানবাহনে যেতে সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট। ভারত সীমান্তের কাছাকাছি এই গ্রামেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নিয়েছিল।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে কী ঘটেছিল?
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয় এবং সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তাজউদ্দীন আহমদ জায়গাটির নাম দেন মুজিবনগর।
স্মৃতিসৌধের ২৩টি স্তম্ভ কী বোঝায়?
স্থপতি তানভীর নকীবের নকশায় নির্মিত মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে ২৩টি ত্রিভুজাকৃতি কংক্রিট স্তম্ভ আছে। এই ২৩টি স্তম্ভ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসনের ২৩ বছর এবং সেই সময়ে বাঙালির ধারাবাহিক সংগ্রামের প্রতীক। স্তম্ভগুলো উদীয়মান সূর্যের আভাস দেয় এবং বেদির অর্ধেক অংশ ঢেকে রাখে।
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ ফি আছে কি?
বিভিন্ন ভ্রমণ নির্দেশিকা অনুযায়ী কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে ঘুরতে সাধারণত কোনো প্রবেশ ফি লাগে না। তবে জাদুঘর অংশ বা বিশেষ আয়োজনের নিয়ম সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, তাই যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে বা মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বর্তমান নিয়ম যাচাই করে নেওয়া ভালো।
ঢাকা থেকে মুজিবনগর যেতে কত সময় লাগে?
ঢাকা থেকে মেহেরপুরের বাসে সময় লাগে আনুমানিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা, রুট ও যানজটের ওপর নির্ভর করে। মেহেরপুর শহর থেকে মুজিবনগর কমপ্লেক্স পর্যন্ত আরও প্রায় ৩০ মিনিট লাগে। তাই ঢাকা থেকে একদিনে ঘুরে আসা কষ্টকর; মেহেরপুরে এক রাত থাকলে ভ্রমণটি আরামদায়ক হয়।
মুজিবনগর কমপ্লেক্স ঘুরতে কত সময় লাগবে?
কমপ্লেক্সটি ভালোভাবে ঘুরতে সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় রাখা ভালো। এর মধ্যে স্মৃতিসৌধ, শপথস্থান, ১১ সেক্টরের মানচিত্র, আম্রকানন, গোলাপ বাগান, ভাস্কর্য ও জাদুঘর দেখা যায়। সঙ্গে আমঝুপি নীলকুঠি যোগ করলে পুরো দিনের ভ্রমণসূচি তৈরি হয়।
