দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে রূপসা সেতু শুধু নদী পারাপারের একটি মাধ্যম নয়; এটি একটি যুগের সাক্ষী, একটি অঞ্চলের অগ্রযাত্রার প্রতীক। খুলনা শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া রূপসা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতুর আনুষ্ঠানিক নাম খান জাহান আলী সেতু। প্রায় 1.60 কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি খুলনা শহরকে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। প্রতিদিন হাজারো যানবাহন এই সেতু দিয়ে পার হয়, আর সকাল-সন্ধ্যায় সেতুর পাশে ভিড় জমান হাঁটতে আসা মানুষ। নদীর বুকে ভেসে যাওয়া নৌকা, দূরে সারি সারি জাহাজ আর সূর্যাস্তের রঙিন আকাশ—সব মিলিয়ে রূপসা সেতু আজ খুলনার অন্যতম প্রিয় ভ্রমণগন্তব্য।

নামের পেছনের ইতিহাস

রূপসা সেতুর আনুষ্ঠানিক নাম খান জাহান আলী সেতু। এই নামকরণ করা হয়েছে মধ্যযুগের বিখ্যাত সাধক ও শাসক খান জাহান আলীর নামে। পঞ্চদশ শতকে তিনি বাগেরহাট অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন এবং খলিফাতাবাদ নগর প্রতিষ্ঠা করেন। ষাটগম্বুজ মসজিদসহ তার নির্মিত বহু স্থাপনা আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণাঞ্চলের এই মহান ব্যক্তিত্বের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতেই সেতুটির নাম রাখা হয় খান জাহান আলী সেতু। স্থানীয়দের মুখে মুখে অবশ্য এটি রূপসা সেতু বা রূপসা ব্রিজ নামেই বেশি পরিচিত।

সেতু নির্মাণের গল্প

একসময় রূপসা নদী পার হতে হতো ফেরি কিংবা লঞ্চে। মোংলা বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন এবং দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত—সবকিছুই নির্ভর করত নৌপথের ওপর। বর্ষায় উত্তাল নদীতে ফেরি চলাচল ব্যাহত হলে কার্যত থমকে যেত পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ। এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে রূপসা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ নির্মাণকাজ শেষে 21 মে 2005 সালে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। প্রায় 800 কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট প্রযুক্তিতে তৈরি, যার দৈর্ঘ্য প্রায় 1.60 কিলোমিটার এবং প্রস্থ 16.48 মিটার। উদ্বোধনের পর থেকে সেতুটি খুলনা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

রূপসা সেতু খুলনা
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Leonkazi007, CC BY-SA 4.0)

এক নজরে রূপসা সেতু

বিষয় তথ্য
আনুষ্ঠানিক নামখান জাহান আলী সেতু
অবস্থানরূপসা নদী, খুলনা
দৈর্ঘ্যপ্রায় 1.60 কিলোমিটার
প্রস্থ16.48 মিটার
নির্মাণ প্রযুক্তিপ্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট
উদ্বোধন21 মে 2005
নির্মাণ ব্যয়প্রায় 800 কোটি টাকা
টোলপ্রযোজ্য নয়

দর্শনার্থীরা যা দেখবেন

সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে দুই পাশে রূপসা নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি চোখে পড়ে। নদীতে ভেসে চলা নৌকা ও ট্রলার, দূরে নোঙর করা জাহাজের সারি—এই দৃশ্য সহজেই মন কাড়ে। বিকেলের দিকে সেতুতে হাঁটতে আসেন অসংখ্য মানুষ; সূর্যাস্তের সময় নদীর পানিতে রঙের খেলা দেখতে দারুণ লাগে। সন্ধ্যা নামলে সেতুর আলোকসজ্জা পুরো এলাকাকে মোহনীয় করে তোলে, তখন ছবি তোলার জন্য ভিড় আরও বাড়ে। সেতুর দুই প্রান্তেই দাঁড়িয়ে ছবি তোলার চমৎকার জায়গা আছে। লবণচরা প্রান্ত থেকে নদীর পাড় ধরে কিছুটা হেঁটে গেলে নদী ও সেতুর একসঙ্গে প্যানোরামিক দৃশ্য পাওয়া যায়।

রূপসা সেতু
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Balaram Mahalder, CC BY-SA 4.0)

রূপসা সেতু ও অঞ্চলের অর্থনীতি

শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও রূপসা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য খুলনা হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায় এই সেতুর ওপর দিয়েই। সেতু হওয়ার আগে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানকে; এখন সেই ভোগান্তি নেই। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিপণ্য, মাছ ও চিংড়ি দ্রুত ঢাকাসহ বড় শহরের বাজারে পৌঁছাতে পারছে। এ কারণে সেতুটিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়।

যাওয়ার সেরা সময়

বছরের শীতকাল, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, রূপসা সেতু ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময়। দিনের বেলায় গরম এড়াতে বিকেল 4টার পর যাওয়াই ভালো। সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করতে চাইলে বিকেল 5টার মধ্যে সেতুতে পৌঁছে যান। বর্ষায় নদীতে পানি বাড়লে সেতুর ওপর থেকে উত্তাল রূপসার রূপ দেখতেও অনেকে আসেন, তবে তখন সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়া যায় ট্রেন, বাস কিংবা লঞ্চে। ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচি ও ভাড়া জেনে নিলে যাত্রার পরিকল্পনা করা সহজ হয়। খুলনাগামী জনপ্রিয় রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনে করেও আসতে পারেন। বাসে যেতে চাইলে অনলাইনে বাস টিকিট কাটার উপায় দেখে আগেই টিকিট কেটে রাখুন।

খুলনা শহর থেকে সেতুটি খুব দূরে নয়। শহরের সোনাডাঙ্গা বা শিববাড়ি মোড় থেকে ইজিবাইক, সিএনজি বা রিকশায় লবণচরা হয়ে সহজেই সেতুতে পৌঁছানো যায়। খুলনা জিরো পয়েন্ট থেকে দক্ষিণ দিকে গেলেই সেতুর পথ পাবেন।

যোগাযোগ

ঠিকানা: রূপসা সেতু, লবণচরা, খুলনা
জাতীয় জরুরি সেবা: 999

তথ্যসূত্র

রূপসা সেতুর আনুষ্ঠানিক নাম কী?

রূপসা সেতুর আনুষ্ঠানিক নাম খান জাহান আলী সেতু। মধ্যযুগের সাধক ও শাসক খান জাহান আলীর নামে এই সেতুর নামকরণ করা হয়েছে।

রূপসা সেতু কবে উদ্বোধন করা হয়?

21 মে 2005 সালে রূপসা সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

রূপসা সেতুর দৈর্ঘ্য কত?

সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় 1.60 কিলোমিটার এবং প্রস্থ 16.48 মিটার।

রূপসা সেতু পার হতে কি টোল দিতে হয়?

না, এই সেতু পারাপারে কোনো টোল দিতে হয় না।

খুলনা শহর থেকে রূপসা সেতু কীভাবে যাবো?

শহরের সোনাডাঙ্গা বা শিববাড়ি মোড় থেকে ইজিবাইক, সিএনজি বা রিকশায় লবণচরা হয়ে সহজেই সেতুতে যাওয়া যায়।

রূপসা সেতু দেখার সেরা সময় কোনটি?

শীতকালে বিকেলের দিকে, বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় সেতুর সৌন্দর্য সবচেয়ে মনোরম লাগে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top