সাকরাইন ঘুড়ি উৎসব এলে পুরান ঢাকার আকাশ ভরে ওঠে হাজারো রঙিন ঘুড়িতে। ঢোলের তালে মুখরিত হয় সরু গলিগুলো, আর সন্ধ্যা নামতেই আকাশ ঝলমল করে আতশবাজি ও ফানুসের আলোয়। ঢাকার সবচেয়ে পুরনো ও প্রাণবন্ত এই উৎসব শুধু একটি দিনের আনন্দ নয়; এটি পুরান ঢাকার মানুষের ঐতিহ্য, আবেগ আর সামাজিক বন্ধনের উৎসব।

সাকরাইন কী ও কবে পালিত হয়

সাকরাইন হলো পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব, যা প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তিতে পালিত হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই দিনটি সাধারণত পড়ে 14 জানুয়ারি। এই উৎসব মূলত মকর সংক্রান্তি উদযাপনের স্থানীয় রূপ — ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই দিনে ঘুড়ি ওড়ানো, পিঠা-পায়েস আর সূর্যের গতি উদযাপনের রীতি রয়েছে (মকর সংক্রান্তি সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় পড়ুন)।

সাকরাইনের দিন সকাল থেকেই পুরান ঢাকার প্রতিটি বাড়ির ছাদে শুরু হয় ঘুড়ি ওড়ানো। বিকেল গড়াতেই জমে ওঠে ঘুড়ি কাটাকাটির প্রতিযোগিতা — একটি ঘুড়ি আরেকটির সুতো কেটে দেওয়ার এই খেলা ঘিরে উত্তেজনা থাকে তুঙ্গে। সন্ধ্যা নামলে আকাশ ভরে ওঠে আতশবাজি আর রঙিন ফানুসে (সাকরাইন সম্পর্কে উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ)।

উৎসবের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ধারণা করা হয়, মুঘল আমল থেকেই ঢাকা অঞ্চলে ঘুড়ি ওড়ানোর চল ছিল। ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার মহল্লাগুলোতে খোলা মাঠের অভাব পূরণ করত বাড়ির ছাদ; আর সেই ছাদগুলোই হয়ে উঠল সামাজিক মিলনের কেন্দ্র। পৌষ সংক্রান্তির দিনে শীতের শেষ রোদে ঘুড়ি ওড়ানো, পিঠা খাওয়া আর পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে আড্ডা — এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠল সাকরাইনের ঐতিহ্য।

একসময় যা ছিল কয়েকটি মহল্লার ঘরোয়া উৎসব, আজ তা পরিণত হয়েছে ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশে। লালবাগ, শাঁখারিবাজার, সূত্রাপুর, বংশালের পুরনো পরিবারগুলো এখনো এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে; আর নতুন প্রজন্মের হাত ধরে সাকরাইন পৌঁছে গেছে সারা দেশের মানুষের কাছে।

সাকরাইন উৎসব
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Bjankuloski06, CC BY-SA 4.0)

ঘুড়ির জগৎ: সাকরাইনের নানা রঙের ঘুড়ি

সাকরাইনে নানা আকৃতি ও নামের ঘুড়ি দেখা যায়। প্রতিটি ঘুড়ির নিজস্ব স্বভাব আছে — কোনোটি আকাশে দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকে, কোনোটি আবার হালকা বাতাসেই চটপটে নড়াচড়া করে। উৎসবের কয়েকদিন আগে থেকেই পুরান ঢাকার বাজারে ঘুড়ি, সুতো আর লাটাইয়ের দোকানে ভিড় জমে।

ঘুড়ির নামবৈশিষ্ট্য
চিল ঘুড়িবড় আকৃতির ঘুড়ি; আকাশে অনেকক্ষণ স্থির থাকে, দূর থেকে সহজে চোখে পড়ে
পান ঘুড়িপানের পাতার মতো আকৃতি; হালকা ও চটপটে, কাটাকাটির খেলায় জনপ্রিয়
চোখদার ঘুড়িমাঝখানে চোখের মতো নকশা থাকে; দেখতে আকর্ষণীয়
বগ্গা ঘুড়িছোট আকারের ঘুড়ি; শিশুদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়

কাটাকাটির খেলায় জিততে ঘুড়ির সুতোয় বিশেষ প্রলেপ দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় মাঞ্জা। মাঞ্জা দেওয়া সুতো ধারালো হয়, ফলে প্রতিপক্ষের ঘুড়ির সুতো সহজে কেটে যায়। এই খেলা ঘিরেই সাকরাইনের সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা তৈরি হয়।

কোথায় দেখবেন সেরা আয়োজন

সাকরাইনের আমেজ পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি মহল্লাতেই পাওয়া যায়, তবে কিছু এলাকায় আয়োজন হয় বিশেষ জমকালো। ঘুরে দেখার ফাঁকে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাও দেখে নিতে পারেন — যেমন সবুজে ঘেরা বালদা গার্ডেন কিংবা স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন ঝিল মসজিদ।

এলাকাকেন যাবেন
লালবাগলালবাগ কেল্লার আশপাশের ছাদ থেকে একসঙ্গে শত শত ঘুড়ি দেখা যায়
শাঁখারিবাজারসরু গলি ও পুরনো বাড়ির ছাদে ঘন আয়োজন; ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ
সূত্রাপুরনদীর কাছাকাছি খোলা আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর চমৎকার দৃশ্য
বংশালস্থানীয় পরিবারগুলোর আন্তরিক আয়োজন ও ঐতিহ্যবাহী খাবার

কিভাবে পৌঁছাবেন

সাকরাইনের দিন পুরান ঢাকায় প্রচণ্ড ভিড় হয়, তাই আগেভাগে পরিকল্পনা করে বের হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নিচে যাতায়াতের মাধ্যমগুলো দেওয়া হলো:

মাধ্যমপরামর্শ
মেট্রো রেলমতিঝিল বা সচিবালয় স্টেশনে নেমে রিকশায় পুরান ঢাকা; ভিড় এড়াতে সকালের দিকে যাত্রা করুন
বাসঢাকার বাইরে থেকে শান্তি পরিবহন বাসে ঢাকায় এসে পুরান ঢাকার দিকে যান
রিকশাপুরান ঢাকার সরু গলিতে চলাচলের সবচেয়ে সুবিধাজনক বাহন
লঞ্চসদরঘাট টার্মিনাল থেকে নদীপথে এলে পাবেন ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা

সেরা সময় ও ভ্রমণ টিপস

ঘুড়ি ওড়ানো দেখার সেরা সময় সকাল 10টা থেকে বিকেল 4টা। এই সময়ে আকাশে সবচেয়ে বেশি ঘুড়ি থাকে আর কাটাকাটির খেলাও জমে ওঠে। আতশবাজি ও ফানুস দেখতে চাইলে সন্ধ্যা 6টার পর ছাদ বা কোনো খোলা জায়গায় থাকুন।

  • ভিড় এড়াতে দুপুরের আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যান
  • অনেক বাড়ির ছাদ ব্যক্তিগত; ছাদে ওঠার আগে অনুমতি নিন
  • শিশুদের নিয়ে গেলে আতশবাজি ও ভিড় থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন
  • ঘুড়ির ধারালো সুতোয় হাত কাটা এড়াতে সতর্ক থাকুন
  • ছবি তুলতে চাইলে অতিরিক্ত ব্যাটারি ও মেমোরি কার্ড সঙ্গে রাখুন
  • ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে স্থানীয় দোকানগুলোতে থামুন
ঘুড়ি উৎসব
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Dead.rabbit, CC BY-SA 3.0)

যোগাযোগ

ঠিকানা: পুরান ঢাকা, ঢাকা 1100, বাংলাদেশ। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা: 999।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সাকরাইন ঘুড়ি উৎসব কবে পালিত হয়?

প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তিতে সাকরাইন পালিত হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই দিনটি সাধারণত 14 জানুয়ারি পড়ে।

সাকরাইন দেখার সেরা জায়গা কোনটি?

লালবাগ, শাঁখারিবাজার, সূত্রাপুর ও বংশাল এলাকায় সাকরাইনের সবচেয়ে জমকালো আয়োজন হয়। লালবাগ কেল্লার আশপাশের ছাদ থেকে একসঙ্গে শত শত ঘুড়ি দেখা যায়।

সাকরাইনে কী কী আয়োজন থাকে?

সকাল থেকে ঘুড়ি ওড়ানো ও কাটাকাটির প্রতিযোগিতা, বিকেলে ঢোল-বাদ্য আর সন্ধ্যায় আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানো হয়। সঙ্গে থাকে পিঠা-পায়েসসহ ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন।

সাকরাইন দেখতে যাওয়ার সেরা সময় কখন?

ঘুড়ি ওড়ানো দেখার জন্য সকাল 10টা থেকে বিকেল 4টা সেরা সময়। আতশবাজি দেখতে চাইলে সন্ধ্যা 6টার পর ছাদ বা খোলা জায়গায় থাকুন।

ঢাকার বাইরে থেকে কীভাবে যাবেন?

বাস বা লঞ্চে ঢাকায় এসে মেট্রো রেল বা রিকশায় পুরান ঢাকায় পৌঁছানো যায়। সাকরাইনের দিন ভিড় বেশি থাকে, তাই সকালের দিকে যাত্রা করাই ভালো।

সাকরাইনের সময় কী সতর্কতা নেবেন?

ভিড় ও আতশবাজি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন, ঘুড়ির ধারালো সুতো থেকে সতর্ক থাকুন এবং ব্যক্তিগত ছাদে ওঠার আগে অনুমতি নিন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top