খুলনা বিভাগের বাগেরহাট শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক মসজিদ — ষাট গম্বুজ মসজিদ। সুলতানি আমলের স্থাপত্যকলার সবচেয়ে বড় ও চমকপ্রদ নিদর্শন এটি। 1985 সালে ইউনেস্কো ‘হিস্টরিক মসজিদ সিটি অব বাগেরহাট’-এর অংশ হিসেবে একে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। প্রায় 600 বছরের পুরোনো এই মসজিদে আজও নিয়মিত নামাজ হয়, আর প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এর গম্বুজের সারি দেখতে ভিড় জমান।

ষাট গম্বুজ মসজিদ
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (TanvirSdq, CC BY-SA 4.0)

কে বানিয়েছিলেন এই মসজিদ?

ষাট গম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেন পঞ্চদশ শতকের সাধক-সেনাপতি খান জাহান আলী। সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে তিনি সুন্দরবনের প্রান্তে ‘খলিফাতাবাদ’ নামে একটি সমৃদ্ধ নগর গড়ে তোলেন। ঐতিহাসিকদের ধারণা, 1442 সালের দিকে এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং 1459 সালে শেষ হয়। খান জাহান শুধু মসজিদই বানাননি — তিনি এলাকায় বহু দীঘি খনন করেন, রাস্তাঘাট তৈরি করেন এবং মানুষের মধ্যে ইসলামের প্রচার করেন। তাঁর নামে খুলনায় খান জাহান আলী সেতু নির্মিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর বাগেরহাটে তাঁর মাজার ও দরগাহ গড়ে ওঠে, যা আজও বহু মানুষের তীর্থস্থান।

ষাট গম্বুজ, অথচ গম্বুজ আসলে 77টি!

মসজিদটির সবচেয়ে মজার বিষয় লুকিয়ে আছে এর নামে। ‘ষাট গম্বুজ’ বলা হলেও এখানে গম্বুজ আছে মোট 77টি — 7 সারিতে 11টি করে, আর চার কোণায় আরও কয়েকটি। তাহলে নামে ষাট কেন এলো? ধারণা করা হয়, মসজিদের ভেতরে আছে 60টি পাথরের স্তম্ভ। আরবি ‘আমুদ’ শব্দের অর্থ স্তম্ভ — কালের বিবর্তনে এই ‘ষাট আমুদ’ মুখে মুখে বদলে ‘ষাট গম্বুজ’ হয়ে গেছে বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন। অর্থাৎ, আসল অর্থ হয়তো ছিল ‘ষাট স্তম্ভের মসজিদ’।

স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য

তুঘলক ধাঁচের এই মসজিদের দেয়াল অস্বাভাবিক মোটা — প্রায় 1.8 মিটার — আর ওপরের দিকে কিছুটা সরু হয়ে গেছে। বাইরে থেকে মাপলে মসজিদটি 148 ফুট লম্বা ও 101 ফুট চওড়া। ভেতরে 60টি পাথরের স্তম্ভ পুরো জায়গাটিকে খিলানযুক্ত বহু সারিতে ভাগ করেছে, আর সেই স্তম্ভগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে গম্বুজগুলো। মাঝের সারির 7টি গম্বুজ চারচালা বাংলা ধরনের, বাকিগুলো গোলাকার। পশ্চিম দেয়ালে আছে 11টি মেহরাব, যার মাঝেরটি বাইরের দিকে বেরিয়ে এসেছে। পূর্ব দিকের 11টি খিলানযুক্ত দরজা দিয়ে মসজিদে ঢোকা যায়।

ষাট গম্বুজ মসজিদের দৃশ্য
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (TanvirSdq, CC BY-SA 4.0)

বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা

1985 সালে ইউনেস্কো বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে (তালিকা নম্বর 321)। এই তালিকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ষাট গম্বুজ মসজিদ। সুলতানি যুগের নগর পরিকল্পনা ও ইটের স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন হিসেবে এটি এই স্বীকৃতি পায়। ইউনেস্কোর অফিসিয়াল তালিকায় বাগেরহাটের এই ঐতিহাসিক শহর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।

ঘুরে দেখার মতো জায়গা

শুধু মসজিদ দেখেই ফিরে যাবেন না — আশপাশে আরও অনেক কিছু আছে:

  • মসজিদের ভেতরে 60টি স্তম্ভের সারি ও খিলানগুলো ভালো করে দেখুন
  • পশ্চিম দেয়ালের 11টি মেহরাব ও মাঝের বর্ধিত মেহরাব
  • পাশেই নয় গম্বুজ মসজিদ, বিবি বেগনী মসজিদ ও সিঙ্গাইর মসজিদ
  • খান জাহান আলীর মাজার, দরগাহ ও ঘোড়াদীঘি
  • মসজিদ প্রাঙ্গণের পাশে প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর

এক নজরে ষাট গম্বুজ মসজিদ

বিষয়তথ্য
অবস্থানবাগেরহাট সদর, খুলনা বিভাগ
নির্মাতাখান জাহান আলী
নির্মাণকাল1442–1459 (পঞ্চদশ শতক)
স্থাপত্য ধাঁচতুঘলক / সুলতানি
গম্বুজ সংখ্যা77টি
স্তম্ভ60টি পাথরের স্তম্ভ
আকার (বহির্ভাগ)148 × 101 ফুট
ইউনেস্কো স্বীকৃতি1985 (বিশ্ব ঐতিহ্য)
দূরত্ববাগেরহাট শহর থেকে ~5 কিমি, ঢাকা থেকে ~320 কিমি

কীভাবে যাবেন

ঢাকার সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে বাগেরহাটের সরাসরি বাস পাওয়া যায়; সময় লাগে 6-7 ঘণ্টা। খুলনা শহর থেকে বাগেরহাট মাত্র 1 ঘণ্টার পথ — খুলনা ঘুরতে গেলে বেলস পার্কও দেখে আসতে পারেন। বাগেরহাট শহর থেকে মসজিদটি প্রায় 5 কিলোমিটার দূরে; রিকশা, অটো বা সিএনজিতে সহজে যাওয়া যায়। একই জেলায় মংলা বন্দর এলাকাও ঘুরে দেখার মতো। ভ্রমণের সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। জুমার নামাজের সময় ভিড় বেশি থাকে; দর্শনার্থীদের শালীন পোশাক পরার অনুরোধ করা হয়।

যোগাযোগ

ঠিকানা: ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট সদর, বাগেরহাট।
জরুরি প্রয়োজনে: জাতীয় জরুরি সেবা 999।

ষাট গম্বুজ মসজিদ কোথায় অবস্থিত?

খুলনা বিভাগের বাগেরহাট সদরে। বাগেরহাট শহর থেকে প্রায় 5 কিলোমিটার দূরে মসজিদটি অবস্থিত; ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় 320 কিলোমিটার।

মসজিদটি কে নির্মাণ করেন?

পঞ্চদশ শতকের সাধক-সেনাপতি খান জাহান আলী। 1442 সালের দিকে নির্মাণ শুরু হয়ে 1459 সালে শেষ হয় বলে ধারণা করা হয়।

মসজিদে আসলে কতটি গম্বুজ আছে?

77টি। ভেতরে 60টি পাথরের স্তম্ভ আছে; ‘ষাট আমুদ’ (ষাট স্তম্ভ) শব্দটি বদলে ‘ষাট গম্বুজ’ হয়েছে বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।

এটি কি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য?

হ্যাঁ। 1985 সালে ‘হিস্টরিক মসজিদ সিটি অব বাগেরহাট’ নামে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় (তালিকা নম্বর 321) অন্তর্ভুক্ত হয়।

ষাট গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণের সেরা সময় কখন?

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি — শীতকালে আবহাওয়া মনোরম থাকে। জুমার নামাজের সময় ভিড় বেশি হয়, তাই অন্য সময় যাওয়া সুবিধাজনক।

আশপাশে আর কী কী দেখা যায়?

নয় গম্বুজ মসজিদ, বিবি বেগনী মসজিদ, সিঙ্গাইর মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজার ও ঘোড়াদীঘি, এবং মসজিদ প্রাঙ্গণের প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর। মসজিদের ইতিহাস নিয়ে উইকিপিডিয়াতেও বিস্তারিত পড়তে পারেন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top