পুরান ঢাকার অলিগলি পেরিয়ে আরমানিটোলায় পৌঁছালেই চোখে পড়বে নীল তারায় ঝলমলে এক মসজিদ — তারা মসজিদ (Tara Masjid)। তিন শতকেরও বেশি পুরনো এই মসজিদে মুঘল যুগের সরল স্থাপত্যের সঙ্গে বিংশ শতকের রঙিন টালি-শিল্পের অপূর্ব মিলন ঘটেছে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের কাছে এটি পবিত্র ইবাদতের স্থান, আর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ঢাকার অন্যতম দর্শনীয় ঐতিহাসিক নিদর্শন।

সংক্ষেপে:

  • তারা মসজিদ (Tara Masjid) ঢাকার পুরান শহরের আরমানিটোলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ, যা নীল তারকা-নকশার চিনি-টিকরি টালির জন্য বিখ্যাত।
  • 18শ শতকের গোড়ার দিকে মির্জা গোলাম পীরের হাতে নির্মিত সরল তিন-গম্বুজ মসজিদটি 1926 সালে আলী জান ব্যাপারীর অর্থায়নে সংস্কার ও সম্প্রসারিত হয়।
  • মসজিদের দেয়াল ও গম্বুজে জাপানি ও ইংরেজ চিনামাটির টালিতে নীল তারার মোজাইক; কিছু টালিতে জাপানের মাউন্ট ফুজি পর্বতের ছবিও রয়েছে।
  • এখানে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়; নামাজের সময়ের বাইরে শালীন পোশাকে দর্শনার্থীরা মসজিদ ঘুরে দেখতে পারেন।
  • সদরঘাট বা গুলিস্তান থেকে রিকশা বা সিএনজিতে সহজেই পৌঁছানো যায়; শীতকালের সকাল বা বিকেল ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময়।

সূচিপত্র:

মসজিদের অবস্থান ও পরিচিতি

তারা মসজিদ (Tara Masjid) অবস্থিত ঢাকার পুরান শহরের আরমানিটোলা এলাকায়, আব্দুল খায়রাত সড়কে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এই ঐতিহাসিক মহল্লায় মসজিদটি তিন শতকেরও বেশি সময় ধরে ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। সরু গলি আর পুরনো দালানকোঠার মাঝে হঠাৎ নীল টালিতে মোড়া মসজিদটি দেখে যে কেউ থমকে দাঁড়াবেন।

মসজিদটি এখনো পুরোদমে সক্রিয় — প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিদের ভিড় জমে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এটি ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপত্য নিদর্শন। পুরান ঢাকা ভ্রমণে এলে লালবাগ কেল্লা দেখার পাশাপাশি তারা মসজিদ ঘুরে যাওয়া যায় একই দিনে।

ইতিহাস ও স্থাপত্য

তারা মসজিদের ইতিহাস শুরু 18শ শতকের প্রথম দিকে। মুঘল আমলের ঢাকার অভিজাত ব্যক্তি মির্জা গোলাম পীর তখন আরমানিটোলায় একটি সরল আয়তাকার মসজিদ নির্মাণ করেন — প্রায় 10 মিটার লম্বা ও 4 মিটার চওড়া, তিনটি গম্বুজবিশিষ্ট। সেই সময় এটি ছিল এলাকার মুসল্লিদের সাধারণ একটি নামাজের স্থান; বাইরে থেকে দেখে এর বিশেষত্ব বোঝার উপায় ছিল না।

মসজিদের চেহারা বদলে যায় 1926 সালে। ঢাকার ব্যবসায়ী আলী জান ব্যাপারীর অর্থায়নে মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। পূর্ব দিকে একটি বারান্দা যোগ করা হয় এবং পুরো মসজিদ মুড়ে দেওয়া হয় রঙিন টালির মোজাইকে। এই টালিগুলোর মধ্যে ছিল জাপান ও ইংল্যান্ড থেকে আনা চিনামাটির টালি — যেগুলোতে আঁকা ছিল নীল তারার নকশা। সেই তারার নকশা থেকেই মসজিদটি “তারা মসজিদ” নামে পরিচিতি পায়।

তারা মসজিদের পূর্ব দিক, ঢাকা
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Gangulybiswarup, CC BY 3.0)

টালির কাজে ব্যবহৃত হয় “চিনি-টিকরি” পদ্ধতি — অর্থাৎ চীনা মাটির টুকরো জোড়া লাগিয়ে তৈরি মোজাইক। মজার বিষয় হলো, সংস্কারের সময় আনা কিছু জাপানি টালিতে ছিল মাউন্ট ফুজি পর্বতের ছবি; সেই টালিও মসজিদের দেয়ালে স্থান পেয়েছে। পরবর্তীতে 1987 সালে মসজিদটিকে পাঁচ-গম্বুজ আকারে রূপ দেওয়া হয়। চার কোণে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির মিনার, আর গম্বুজগুলোর চূড়ায় পদ্ম ও কলস-আকৃতির অলংকরণ। মসজিদের এই অনন্য রূপ এতটাই পরিচিত যে বাংলাদেশের 100 টাকার নোটেও এর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। (উইকিপিডিয়া)

যা যা দেখবেন

মসজিদ চত্বরে ঢুকলে প্রথমেই নজর কাড়বে পূর্ব দিকের সম্মুখভাগ — নীল তারার মোজাইকে মোড়া খিলানযুক্ত প্যানেলগুলো রোদে ঝলমল করে। ভেতরে ঢুকে দেখুন:

  • তারকা-মোজাইকের দেয়াল: নীল, সাদা ও সবুজ টালিতে ফুটিয়ে তোলা অসংখ্য তারার নকশা মসজিদের প্রতিটি দেয়ালে।
  • নামাজঘরের অলংকরণ: ভেতরের দেয়ালে ফুলের টালি আর মেহরাবের চারপাশে নিখুঁত মোজাইকের কাজ।
  • মাউন্ট ফুজির টালি: দেয়ালের টালির ভিড়ে খুঁজে দেখুন জাপানের ফুজি পর্বতের ছবিওয়ালা টালি — এটি মসজিদের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক অংশ।
  • পাঁচ গম্বুজ ও মিনার: পাঁচটি গম্বুজ, চার কোণের অষ্টভুজ মিনার এবং চূড়ার পদ্ম-কলস অলংকরণ — দূর থেকে দেখতেও অসাধারণ।
  • চিনি-টিকরির কারুকাজ: কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় ক্ষুদ্র টালির টুকরো জোড়া লাগিয়ে কত যত্নে এই শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়েছে।
তারা মসজিদের নামাজঘর

ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Faisal.Omar, CC BY 3.0)

স্থাপত্যপ্রেমীরা চাইলে বাংলাপিডিয়ায় মসজিদটির বিস্তারিত বিবরণও পড়ে দেখতে পারেন।

কিভাবে পৌঁছাবেন

ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় পৌঁছানো সহজ। নিচের তালিকা থেকে সুবিধামতো মাধ্যম বেছে নিন:

যেখান থেকে মাধ্যম আনুমানিক সময়
সদরঘাট রিকশা 15-20 মিনিট
গুলিস্তান সিএনজি / অটোরিকশা 20-30 মিনিট
মতিঝিল সিএনজি / বাস + রিকশা 25-35 মিনিট
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সিএনজি / ট্যাক্সি 60-90 মিনিট (যানজটভেদে)

পুরান ঢাকার সরু গলিতে রিকশাই সবচেয়ে সুবিধাজনক বাহন। ভাড়া আগেই দরদাম করে ঠিক করে নিন। সদরঘাট এলাকা ঘুরতে এলে সারিঘাট ভ্রমণের সঙ্গেও মসজিদ দেখা মিলিয়ে নিতে পারেন।

ভ্রমণের সেরা সময়

তারা মসজিদ ঘুরে দেখার সেরা সময় শীতকাল — নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক ও আরামদায়ক থাকে, ফলে হেঁটে পুরান ঢাকার গলি ঘোরা সহজ হয়। দিনের মধ্যে সকাল 9টা থেকে 11টা অথবা বিকেল 3টা থেকে 5টা সবচেয়ে ভালো; এই সময় নরম আলোয় টালির মোজাইক ছবি তোলার জন্য দারুণ দেখায়।

শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের সময় মসজিদে প্রচুর ভিড় হয়, তাই দর্শনার্থীদের ওই সময় এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। অন্যান্য ওয়াক্তের নামাজের সময়ও ভেতরে প্রবেশ সীমিত থাকতে পারে — নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত বাইরে থেকে স্থাপত্য উপভোগ করুন।

যোগাযোগ

ঠিকানা: তারা মসজিদ, আব্দুল খায়রাত সড়ক, আরমানিটোলা, পুরান ঢাকা, বাংলাদেশ।

মসজিদটি সদরঘাট থেকে অল্প দূরত্বেই; স্থানীয় কাউকে “তারা মসজিদ” বা “আরমানিটোলা মসজিদ” বললেই পথ দেখিয়ে দেবেন।

ভ্রমণ টিপস

  • ধর্মীয় স্থানের মর্যাদা রক্ষায় শালীন পোশাক পরুন; মসজিদে প্রবেশের আগে জুতা খুলে নির্দিষ্ট স্থানে রাখুন।
  • নামাজ চলাকালীন ভেতরে প্রবেশ বা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন; নামাজিদের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাবেন না।
  • ভেতরের ছবি তোলার আগে মসজিদ কর্তৃপক্ষ বা উপস্থিত খাদেমের অনুমতি নিন।
  • মহিলা দর্শনার্থীরা মাথা ঢেকে (ওড়না/হিজাব) প্রবেশ করুন।
  • সঙ্গে পানির বোতল রাখুন; ঘোরাঘুরির ফাঁকে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।
  • একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কার্জন হল ঘুরে আসতে পারেন — ব্রিটিশ আমলের আরেক দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

তারা মসজিদ কোথায় অবস্থিত?

তারা মসজিদ ঢাকার পুরান শহরের আরমানিটোলা এলাকায়, আব্দুল খায়রাত সড়কে অবস্থিত। সদরঘাট থেকে রিকশায় 15-20 মিনিটে সেখানে পৌঁছানো যায়।

তারা মসজিদ কে নির্মাণ করেন?

18শ শতকের গোড়ার দিকে মির্জা গোলাম পীর মসজিদটি নির্মাণ করেন। পরে 1926 সালে ঢাকার ব্যবসায়ী আলী জান ব্যাপারীর অর্থায়নে এর ব্যাপক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়।

মসজিদটি “তারা মসজিদ” নামে পরিচিত কেন?

1926 সালের সংস্কারের সময় মসজিদের দেয়াল ও গম্বুজে নীল তারকা-নকশার চিনি-টিকরি টালির মোজাইক লাগানো হয়। এই তারার নকশা থেকেই মসজিদটি তারা মসজিদ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

দর্শনার্থীরা কি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন?

হ্যাঁ, নামাজের সময়ের বাইরে শালীন পোশাকে ও জুতা খুলে দর্শনার্থীরা মসজিদ ঘুরে দেখতে পারেন। নামাজ চলাকালীন ভেতরে প্রবেশ সীমিত থাকে।

মসজিদের দেয়ালে মাউন্ট ফুজির ছবি কেন?

সংস্কারের সময় জাপান থেকে আনা কিছু চিনামাটির টালিতে মাউন্ট ফুজি পর্বতের ছবি ছিল। সেই টালিগুলোও মসজিদের দেয়ালে লাগানো হয়, যা আজও দেখা যায়।

তারা মসজিদ ভ্রমণের সেরা সময় কখন?

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি শীতকালে সকাল 9টা থেকে 11টা বা বিকেল 3টা থেকে 5টা ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ভিড় এড়িয়ে চলুন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top