হোসেনী দালান ঢাকার পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ইমামবাড়া। মুঘল আমলে 1642 সালে নির্মিত এই ভবনটি শিয়া সম্প্রদায়ের শোক-অনুষ্ঠান ও মজলিশের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মূল ভবন, নওবতখানা ও কবরস্থান মিলিয়ে পুরো কমপ্লেক্সটি পুরান ঢাকার ইতিহাসের একটি জীবন্ত অংশ। এই গাইডে হোসেনী দালানের ইতিহাস, ভেতরে যা দেখবেন, মহরমের তাজিয়া মিছিল, যাওয়ার রুট, সময়সূচি ও ভ্রমণ টিপস — সবকিছু একসঙ্গে পাবেন।
সংক্ষেপে:
- অবস্থান: হোসেনী দালান রোড, বকশীবাজার, পুরান ঢাকা — নাজিমউদ্দিন রোডের পাশে।
- নির্মাণ: 1642 সাল, মীর মুরাদের তত্ত্বাবধানে, সুবাহদার শাহ সুজার আমলে।
- প্রবেশ: সাধারণত টিকিট লাগে না; সাধারণ সময় সকাল 7টা থেকে রাত 10টা পর্যন্ত।
- সেরা অভিজ্ঞতা: সকালে শান্ত পরিবেশে ঘোরা, আর মহরমের 10 দিনের মজলিশ ও আশুরার তাজিয়া মিছিল।
- যাওয়ার সহজ পথ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশন থেকে চানখাঁরপুল হয়ে রিকশা।
সূচিপত্র
- হোসেনী দালান কোথায় ও কেন যাবেন
- হোসেনী দালানের ইতিহাস: 1642 সাল থেকে আজ পর্যন্ত
- ভেতরে যা দেখবেন: মূল ভবন, দিঘি ও নওবতখানা
- মহরম ও আশুরা: তাজিয়া মিছিলের 10 দিন
- কিভাবে যাবেন: মেট্রো, বাস ও রিকশা রুট
- কখন যাবেন, সময়সূচি ও প্রবেশ তথ্য
- আশপাশে ঘোরার পরিকল্পনা: একদিনের পুরান ঢাকা রুট
- কোথায় থাকবেন ও খাবেন
- শিষ্টাচার, নিরাপত্তা ও সতর্কতা
- প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
হোসেনী দালান কোথায় ও কেন যাবেন
হোসেনী দালান পুরান ঢাকার বকশীবাজারে, হোসেনী দালান রোড ও নাজিমউদ্দিন রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, পুরো কমপ্লেক্সটি প্রায় 6.2 বিঘা (প্রায় 8,453 বর্গমিটার) জায়গা জুড়ে বিস্তৃত, আর মূল ভবনটি প্রায় 0.65 বিঘা জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কমপ্লেক্সের উত্তরে প্রধান ফটক, পূর্বে নাজিমউদ্দিন রোড, পশ্চিমে বকশীবাজার, আর দক্ষিণে তাহখানা এলাকা। বুড়িগঙ্গা থেকে এর দূরত্ব প্রায় 1 কিলোমিটার।
এখানে যাওয়ার কারণ শুধু পুরনো একটি ভবন দেখা নয়। হোসেনী দালান ঢাকার শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্র, আবার একই সঙ্গে মুঘল ঢাকার স্থাপত্য ও নগর-ইতিহাসের সাক্ষী। ভবনের পেছনের দিঘি, সামনের প্রাঙ্গণ ও কবরস্থান — এই তিনটি অংশ একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, কীভাবে একটি ধর্মীয় স্থান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি মহল্লার পরিচয়ের অংশ হয়ে থেকেছে। যারা পুরান ঢাকার ইতিহাস বুঝতে চান, তাদের জন্য এটি একটি জরুরি স্টপ।
একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার রাখা ভালো: এটি কোনো জাদুঘর নয়, এটি সক্রিয় উপাসনা ও শোক-অনুষ্ঠানের স্থান। তাই দর্শনার্থী হিসেবে এখানে ঢুকতে হবে শ্রদ্ধা নিয়ে, শান্তভাবে। সাধারণ দিনে পরিবেশ বেশ শান্ত থাকে; মহরমের দিনগুলোতে পরিবেশ বদলে যায় — তখন এটি ভিড়, মজলিশ ও মিছিলের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
হোসেনী দালানের ইতিহাস: 1642 সাল থেকে আজ পর্যন্ত
হোসেনী দালানের ইতিহাস শুরু 1642 সালে। তখন বাংলার সুবাহদার ছিলেন মুঘল শাহজাদা শাহ সুজা। তার আমলে নৌবহর বা নাওয়ারা সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক মীর মুরাদ এই ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মীর মুরাদ স্বপ্নে ইমাম হোসেন (রা.)-কে দেখেন, যিনি তাকে একটি শোক-ভবন নির্মাণ করতে বলেন। সেই স্বপ্ন থেকেই হোসেনী দালানের জন্ম বলে স্থানীয় ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স হিসেবে এটি উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইমামবাড়া।
নির্মাণের পর থেকে ভবনটি বহুবার মেরামত ও পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে গেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে 1807 ও 1810 সালে এটি মেরামত করা হয়। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, 1823 সালে নায়েব নাজিম নুসরাত জং ভবনটিকে বর্তমান রূপের কাছাকাছি অবস্থায় পুনর্নির্মাণ করেন। মীর মুরাদের মৃত্যুর পর ঢাকার নায়েব নাজিমরা এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। 1844 সালে খাজা আলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একটি নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটি কাজ শুরু করে, আর 1891 সালে খাজা আহসানুল্লাহ একক প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
1897 সালের ভূমিকম্পে ভবনের উত্তর অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নবাব আহসানুল্লাহ তখন ভবনটি পুনর্নির্মাণ করেন। এই ধারাবাহিক মেরামতের কারণে আজকের হোসেনী দালানে মুঘল আমলের মূল কাঠামোর সঙ্গে পরবর্তী সময়ের সংযোজনও মিশে আছে। তাই ভবনটিকে দেখতে হবে একটি স্তরে স্তরে গড়ে ওঠা স্থাপত্য হিসেবে, কোনো এক সময়ের স্থির নিদর্শন হিসেবে নয়।
কমপ্লেক্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুকবারা-ই-নায়েব নাজিম। মূল সিঁড়ির বিপরীতে পূর্ব দিকে ছিল এই সমাধিস্থল, যেখানে 8টি কবর ছিল — তার মধ্যে 4টি কবর ঢাকার নায়েব নাজিমদের, যাদের মধ্যে ছিলেন শেষ নায়েব নাজিম নবাব গাজীউদ্দিন হায়দার। মুকবারার ভবনটি 1985 সালের দিকে ভেঙে পড়ে; এখন সীমানা-প্রাচীর ও কবরগুলো টিকে আছে। এই কবরস্থানটি অনেক দর্শনার্থীর চোখ এড়িয়ে যায়, কিন্তু ঢাকার নবাবি আমলের প্রশাসনিক ইতিহাস বুঝতে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
ভেতরে যা দেখবেন: মূল ভবন, দিঘি ও নওবতখানা
উত্তরের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ে দ্বিতল নওবতখানা। নওবত মানে ঢোল বা নাকাড়া — মহরমের মজলিশের সময় জানান দিতে এখান থেকে ঢোল বাজানো হতো। নওবতখানার পাশে আছে গঞ্জ-এ-শহীদান ও কোতোয়ালি দালান, আর আছে গোসলখানা। এই অংশগুলো একসঙ্গে কমপ্লেক্সের প্রবেশ-অঞ্চলের চরিত্র তৈরি করে।
মূল ভবনটি কমপ্লেক্সের মাঝখানে, উঁচু ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সামনের বারান্দা থেকে ভেতরের প্রধান হলে ঢুকলে দেখা যায় উঁচু ছাদ, ঝাড়বাতি, খিলানযুক্ত দরজা ও টালির ওপর ক্যালিগ্রাফির কাজ। ভেতরে রাখা আছে তাজিয়া মোবারক — ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসেন (রা.)-এর স্মরণে তৈরি দুটি ক্ষুদ্র কবর-আকৃতির কাঠামো। এছাড়া আছে আলম (পতাকা), যার মধ্যে পাঞ্জা-আকৃতির আলমও আছে, আর কারবালার যুদ্ধের প্রতীক হিসেবে রাখা তরবারি ও ঢাল। জুলজানাহ — ইমাম হোসেন (রা.)-এর ঘোড়ার প্রতীকী রূপ — মহরমের অনুষ্ঠানের একটি পরিচিত অংশ।

মূল ভবনের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যটি পেছন দিকে। ভবনের ঠিক দক্ষিণে লাগোয়া আছে একটি দিঘি। পেছনের বারান্দা থেকে দিঘির দিকে তাকালে দেখা যায় বড় বড় স্তম্ভ, খিলান ও জালি-কাজের জানালা। দিঘির ওপার থেকে মূল ভবনের দিকে তাকালে পানিতে ভবনের প্রতিফলনসহ পুরো দৃশ্যটি ধরা পড়ে — ছবি তোলার জন্য এটাই সেরা জায়গা। 1904 সালে ফ্রিটজ ক্যাপের তোলা পুরনো ছবির সঙ্গে আজকের এই দৃশ্যের মিল এখনো চোখে পড়ার মতো।

প্রাঙ্গণের কবরস্থানটি আলাদা করে দেখার মতো। এখানে পুরনো কবরগুলোর পাশাপাশি পরবর্তী সময়ের কবরও আছে। কবরস্থানে ঘোরার সময় শান্ত থাকা, কবরের ওপর দিয়ে না হাঁটা ও ছবি তোলার আগে পরিবেশ বোঝা — এই সাধারণ শিষ্টাচারগুলো মেনে চলা জরুরি। যারা ঢাকার পুরনো পরিবারগুলোর ইতিহাসে আগ্রহী, তারা এখানকার কবরফলকগুলো থেকে অনেক তথ্য পাবেন।

কমপ্লেক্সের ভেতরে হোসেনী দালান জামে মসজিদও আছে। মূল ভবন দেখার পর মসজিদের বাইরের স্থাপত্য দেখে নেওয়া যায়, তবে নামাজের সময় ভেতরে দর্শনার্থীদের চলাচল সীমিত থাকতে পারে। পুরো কমপ্লেক্স ঘুরতে সাধারণত 1 থেকে 2 ঘণ্টা সময় লাগে। তাড়াহুড়ো না করে, প্রতিটি অংশের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলে এই স্থানের চরিত্র ভালোভাবে বোঝা যায়।

মহরম ও আশুরা: তাজিয়া মিছিলের 10 দিন
হোসেনী দালানকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে হলে মহরমের কথা জানতে হয়। পুরান ঢাকায় মহরমের ঐতিহ্য নিয়ে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে হোসেনী দালানের আশপাশের মহল্লায় শোক ও স্মরণের পরিবেশ তৈরি হয়। হিজরি বছরের প্রথম মাস মহরমের প্রথম 10 দিন এখানে মজলিশ, মারসিয়া ও নওহা পাঠ এবং মাতমের আয়োজন হয়। এই দিনগুলোতে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষজন ছাড়াও সুন্নি সম্প্রদায়ের অনেক মানুষও এখানে আসেন — কারবালার শোক ঢাকায় ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে গিয়ে একটি শহুরে স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।
10 মহরম, অর্থাৎ আশুরার দিন, মূল তাজিয়া মিছিল বের হয়। 2015 সালে আশুরার প্রাক্কালে হোসেনী দালানের সামনে বোমা হামলায় 2 জন নিহত হওয়ার পর থেকে মিছিলের সময় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। তার পর থেকে মূল মিছিল দিনের বেলায় বের হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিছিলটি সাধারণত সকাল 10টার দিকে হোসেনী দালানের 1 নম্বর গেট থেকে শুরু হয়।
মিছিলের রুট সাধারণত এই পথে যায়: বকশীবাজার লেন, লালবাগ মোড়, শহীদ মিনার রোড, এতিমখানা মোড়, আজিমপুর মোড়, নীলক্ষেত মোড়, মিরপুর রোড, ঢাকা কলেজ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি হয়ে ধানমন্ডি লেকের কারবালায় শেষ হয়। 2025 সালের আশুরায়ও এই রুটেই মিছিল গিয়েছিল বলে সংবাদ সংস্থা বাসস জানিয়েছে। তবে প্রতি বছরের রুট ও সময় কিছুটা বদলাতে পারে, তাই আশুরার সপ্তাহে ডিএমপির নির্দেশনা দেখে নেওয়া জরুরি।
আশুরার দিনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর থাকে। মিছিলের শুরুর পয়েন্টে আর্চওয়ে ও তল্লাশির মধ্য দিয়ে ঢুকতে হয়, মাঝপথ থেকে মিছিলে যোগ দেওয়া যায় না, ধারালো অস্ত্র, আতশবাজি ও দাহ্য বস্তু বহন নিষিদ্ধ থাকে। অতীতের ডিএমপি নির্দেশনায় মিছিলের পতাকার উচ্চতা 12 ফুটের মধ্যে রাখার কথাও বলা হয়েছিল। দর্শক হিসেবে গেলে মিছিলের পথের ধারে দাঁড়িয়ে দেখাই নিরাপদ; মিছিলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করা উচিত নয়। কালো পোশাক এখানে শোকের প্রতীক — দর্শকদেরও শালীন ও গাঢ় রঙের পোশাক পরা ভালো।
মহরমের সময় যাওয়ার আগে দুটি বিষয় মনে রাখুন। প্রথমত, এই 10 দিন এখানে ভিড় অনেক বেশি থাকে, তাই সকালের দিকে যাওয়া ভালো। দ্বিতীয়ত, আশুরার দিন পুরান ঢাকার অনেক রাস্তা মিছিলের জন্য বন্ধ বা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, তাই সেদিন রিকশা বা গাড়িতে স্বাভাবিক রুটে চলা কঠিন হতে পারে। হাতে অতিরিক্ত সময় রাখুন।
কিভাবে যাবেন: মেট্রো, বাস ও রিকশা রুট
হোসেনী দালানে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ মেট্রোরেল ও রিকশার সমন্বয়। ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে মেট্রোরেলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে আসুন। সেখান থেকে চানখাঁরপুল মোড় হয়ে নাজিমউদ্দিন রোড ধরে রিকশায় হোসেনী দালানে পৌঁছানো যায়। এই শেষ অংশের রিকশা ভাড়া আনুমানিক 40 থেকে 80 টাকার মধ্যে থাকে, তবে যানজট ও দরদামের ওপর ভাড়া বদলাতে পারে।
| যাত্রা শুরুর জায়গা | রুট | আনুমানিক খরচ |
|---|---|---|
| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশন | চানখাঁরপুল হয়ে রিকশায় নাজিমউদ্দিন রোড | রিকশা আনুমানিক 40-80 টাকা |
| গুলিস্তান / সায়েদাবাদ | রিকশায় চানখাঁরপুল / বকশীবাজার | রিকশা আনুমানিক 50-100 টাকা |
| শাহবাগ / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা | সরাসরি রিকশা বা সিএনজিতে চানখাঁরপুল হয়ে | দূরত্ব অনুযায়ী, দরদাম করে নিন |
| নিজস্ব গাড়ি | গুলিস্তান বা শাহবাগ হয়ে পুরান ঢাকার দিকে | পার্কিং সংকট — মেট্রো + রিকশা ভালো |
গুলিস্তান বা সায়েদাবাদ থেকে সরাসরি রিকশায় চানখাঁরপুল এলাকায় এসেও হোসেনী দালানে যাওয়া যায়। বাসে এলে গুলিস্তানগামী বাসে চানখাঁরপুল বা গুলিস্তান এলাকায় নেমে রিকশা নেওয়াই সহজ। পুরান ঢাকার গলিগুলো সরু ও যানজটপূর্ণ, তাই নিজস্ব গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢোকার চেয়ে মেট্রো স্টেশন বা গুলিস্তানে নেমে রিকশা নেওয়া অনেক কম ঝামেলার। আশুরার দিন রাস্তা বন্ধ থাকতে পারে, সেদিন হেঁটে বা মিছিলের রুট এড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করুন।
ঢাকার বাইরে থেকে এলে প্রথমে ঢাকার বাস টার্মিনাল বা রেলস্টেশনে পৌঁছে সেখান থেকে মেট্রো বা রিকশা-বাসের সমন্বয়ে গুলিস্তান / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসুন, তারপর উপরের রুটটি অনুসরণ করুন। ফেরার সময়ও একই পথ ব্যবহার করা যায় — চানখাঁরপুল থেকে রিকশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশন বা গুলিস্তান। সন্ধ্যার পর রিকশা পেতে দেরি হতে পারে, তাই ফেরার রিকশা আগেভাগে ঠিক করে রাখা ভালো।
কখন যাবেন, সময়সূচি ও প্রবেশ তথ্য
সাধারণত হোসেনী দালান প্রতিদিন সকাল 7টা থেকে রাত 10টা পর্যন্ত খোলা থাকে বলে বিভিন্ন ভ্রমণ-নির্দেশিকায় উল্লেখ আছে, আর সাপ্তাহিক কোনো বন্ধের দিন নেই বলে জানা যায়। প্রবেশে সাধারণত কোনো টিকিট লাগে না। তবে এটি সক্রিয় ধর্মীয় স্থান, তাই নামাজ বা মজলিশ চলার সময় ভেতরের কিছু অংশে দর্শনার্থীদের চলাচল সীমিত থাকতে পারে।
ঘোরার জন্য সেরা সময় সকালবেলা। সকালে ভিড় কম থাকে, আলো ভালো থাকে, আর দিঘির পাড়ের দৃশ্য সবচেয়ে পরিষ্কার দেখা যায়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি — ঢাকার শীতের মাসগুলো — হাঁটাচলার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। গরমের মাসে দুপুরের রোদে পুরান ঢাকার গলিতে হাঁটা কষ্টকর হতে পারে, তাই সকাল বা বিকেলের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করুন।
আলাদা অভিজ্ঞতার জন্য মহরমের 10 দিন সেরা, তবে তখন ভিড় ও নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য হাতে অতিরিক্ত সময় রাখতে হবে। আশুরার দিন গেলে শুধু মিছিল দেখার পরিকল্পনা করুন, ভেতরের স্থাপত্য খুঁটিয়ে দেখার পরিকল্পনা সেদিন না করাই ভালো। যেকোনো বিশেষ দিনে যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে সময় ও প্রবেশ-নিয়ম যাচাই করে নিন, কারণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা নিরাপত্তার কারণে সময় বদলে যেতে পারে।
আশপাশে ঘোরার পরিকল্পনা: একদিনের পুরান ঢাকা রুট
হোসেনী দালানকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণ দিনের পুরান ঢাকা রুট সাজানো যায়। সকালে হোসেনী দালান দিয়ে শুরু করুন, তারপর রিকশায় লালবাগ কেল্লা যান। মুঘল আমলের এই কেল্লা হোসেনী দালানের সমসাময়িক ঢাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য। দুপুরের দিকে আহসান মঞ্জিল দেখুন, তারপর ঢাকা সদরঘাট থেকে বুড়িগঙ্গার পাড়ের দৃশ্য দেখে নিন।
বিকেলে আরমানিটোলায় আর্মেনীয় চার্চ ঘুরে দেখতে পারেন। 1781 সালের এই গির্জা ও কবরস্থান পুরান ঢাকার বহু-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আরেকটি দিক তুলে ধরে। এই চারটি স্থান একদিনে ঘুরতে হলে সকাল 9টার মধ্যে বের হওয়া ভালো, আর প্রতিটি স্থানে 1 থেকে 2 ঘণ্টা করে সময় রাখুন। দুপুরের খাবারের বিরতি পুরান ঢাকার খাবারের গলিতেই সেরে নেওয়া যায়।
যারা শুধু অর্ধদিন সময় পাবেন, তারা হোসেনী দালান ও লালবাগ কেল্লা — এই দুটি স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকুন। দুটি স্থানই পুরান ঢাকার কেন্দ্রে, আর দুটি মিলিয়ে মুঘল ঢাকার ধর্মীয় ও সামরিক স্থাপত্যের একটি ভালো ধারণা পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার আরও স্থানের খোঁজ পেতে অভিযানের ঢাকার হোটেল গাইড থেকেও এলাকার ধারণা নেওয়া যায়, বিশেষ করে থাকার পরিকল্পনার জন্য।
কোথায় থাকবেন ও খাবেন
হোসেনী দালানের আশপাশে সরাসরি থাকার ব্যবস্থা সীমিত। পুরান ঢাকায় দিনের বেলা ঘুরে রাতে থাকার জন্য গুলিস্তান, মতিঝিল বা শাহবাগ এলাকার হোটেল বেছে নেওয়া সুবিধাজনক। এই এলাকাগুলো থেকে মেট্রো বা রিকশায় পুরান ঢাকায় যাতায়াত সহজ। থাকার বাজেট, এলাকা ও বুকিং টিপসের বিস্তারিত ধারণার জন্য অভিযানের ঢাকার হোটেল গাইডটি দেখে নিন — সেখানে এলাকাভিত্তিক সুবিধা-অসুবিধা আলোচনা করা আছে।
খাওয়ার জন্য পুরান ঢাকাই সেরা জায়গা। বকশীবাজার ও নাজিমউদ্দিন রোডের আশপাশে স্থানীয় খাবারের দোকান আছে, আর একটু এগিয়ে গেলেই পুরান ঢাকার বিখ্যাত খাবারের গলিগুলো পাওয়া যায়। সকালের নাস্তা, দুপুরের বিরিয়ানি বা বিকেলের কাবাব — দিনের প্রতিটি বেলার খাবারই এখানে পাওয়া যায়। দোকান বাছার সময় ভিড় দেখে বাছুন, আর পানি কেনার সময় সিল করা বোতল নিন। মহরমের দিনগুলোতে কিছু দোকান বন্ধ থাকতে পারে বা রুট বদলে যেতে পারে, তাই সেদিন খাবারের পরিকল্পনায় নমনীয়তা রাখুন।
একদিনের ট্রিপে থাকার দরকার না পড়লেও, যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসছেন তারা সকালের ট্রিপের জন্য আগের রাতে গুলিস্তান বা শাহবাগ এলাকায় থাকলে সুবিধা হবে। সকালে মেট্রো ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নেমে রিকশায় হোসেনী দালান — এই রুটটি সকালের দিকে সবচেয়ে কম ঝামেলার।
শিষ্টাচার, নিরাপত্তা ও সতর্কতা
হোসেনী দালান একটি সক্রিয় ধর্মীয় স্থান, তাই এখানে কিছু শিষ্টাচার মেনে চলা জরুরি। শালীন পোশাক পরুন, ভেতরে গলা নামিয়ে কথা বলুন, আর প্রার্থনা বা মজলিশ চলার সময় ছবি তোলা বা ঘোরাঘুরি থেকে বিরত থাকুন। কারো ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। তাজিয়া, আলম বা অন্য ধর্মীয় বস্তুতে হাত দেবেন না। কবরস্থানে শান্ত থাকুন, কবরের ওপর দিয়ে হাঁটবেন না।
নিরাপত্তার দিক থেকে পুরান ঢাকার ভিড়ের গলিতে ব্যাগ ও মোবাইল সামলে রাখুন। ভিড়ের মধ্যে ব্যাগ সামনে রাখা, অপ্রয়োজনীয় মূল্যবান জিনিস না আনা, আর পানি সঙ্গে রাখা — এই সাধারণ নিয়মগুলো এখানেও প্রযোজ্য। মহরমের দিনগুলোতে পুলিশের তল্লাশি ও আর্চওয়ে পার হতে হয়, তাই ব্যাগ হালকা রাখুন, ধারালো কিছু সঙ্গে নেবেন না।
আশুরার দিনে মিছিলের রুটের ধারে দাঁড়িয়ে দেখুন, মিছিলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করবেন না। মিছিলের সময় রাস্তা বন্ধ থাকতে পারে, তাই সেদিন যাতায়াতের জন্য হাতে অতিরিক্ত সময় রাখুন। শিশুদের সঙ্গে গেলে ভিড়ের মধ্যে তাদের হাত ধরে রাখুন, আর একটি নির্দিষ্ট মিলনস্থল আগেভাগে ঠিক করে রাখুন। কোনো সন্দেহজনক বস্তু দেখলে তা না ছুঁয়ে পুলিশকে জানান।
সবশেষে একটি সতর্কতা: ভাড়া, সময়সূচি ও মিছিলের রুট সময়ের সঙ্গে বদলায়। এই গাইডের তথ্য লেখার সময় যাচাই করা হয়েছে, কিন্তু যাওয়ার আগে ওই বছরের মহরমের ঘোষণা ও ডিএমপি নির্দেশনা দেখে নেওয়াই নিরাপদ।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
হোসেনী দালান কোথায় অবস্থিত?
হোসেনী দালান পুরান ঢাকার বকশীবাজারে, হোসেনী দালান রোড ও নাজিমউদ্দিন রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশন থেকে চানখাঁরপুল হয়ে রিকশায় এখানে পৌঁছানো যায়। বুড়িগঙ্গা নদী থেকে এর দূরত্ব প্রায় 1 কিলোমিটার।
হোসেনী দালান কবে নির্মিত হয়েছিল?
হোসেনী দালান 1642 সালে নির্মিত হয়। মুঘল সুবাহদার শাহ সুজার আমলে নৌবহরের তত্ত্বাবধায়ক মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ইমাম হোসেন (রা.)-কে স্বপ্নে দেখার পর মীর মুরাদ এই শোক-ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
হোসেনী দালানে প্রবেশ করতে টিকিট লাগে কি?
সাধারণত হোসেনী দালানে প্রবেশ করতে কোনো টিকিট লাগে না বলে বিভিন্ন ভ্রমণ-নির্দেশিকায় উল্লেখ আছে। এটি একটি সক্রিয় ধর্মীয় স্থান, তাই দর্শনার্থীদের শান্ত পরিবেশ বজায় রাখতে হয়। বিশেষ অনুষ্ঠানের দিন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বদলাতে পারে।
হোসেনী দালান কখন খোলা থাকে?
সাধারণত হোসেনী দালান প্রতিদিন সকাল 7টা থেকে রাত 10টা পর্যন্ত খোলা থাকে বলে জানা যায়। মহরমের দিনগুলোতে ভিড় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রবেশের নিয়ম বদলে যেতে পারে, তাই ওই সময় যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে সময় যাচাই করে নেওয়া ভালো।
মহরমের তাজিয়া মিছিল কখন বের হয়?
আশুরার দিন, অর্থাৎ 10 মহরম, সকালে হোসেনী দালানের 1 নম্বর গেট থেকে মূল তাজিয়া মিছিল বের হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিছিলটি সাধারণত সকাল 10টার দিকে শুরু হয়ে বকশীবাজার, লালবাগ, আজিমপুর, নীলক্ষেত ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি হয়ে ধানমন্ডি লেকের কারবালায় শেষ হয়। প্রতি বছরের সঠিক সময় ও রুটের জন্য ওই বছরের ডিএমপি নির্দেশনা দেখে নিন।
হোসেনী দালানের আশপাশে আর কী দেখা যায়?
একই দিনে লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, ঢাকা সদরঘাট ও আরমানিটোলার আর্মেনীয় চার্চ ঘুরে দেখা যায়। এই চারটি স্থানই পুরান ঢাকার হাঁটা ও রিকশা-দূরত্বের মধ্যে পড়ে, তাই হোসেনী দালানকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণ দিনের পুরান ঢাকা রুট সাজানো সহজ।
