কুড়িগ্রামের উলিপুরে, ধরণীবাড়ী ইউনিয়নের এক শান্ত গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে মুন্সি বাড়ি — প্রায় 200 বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এক জমিদার বাড়ি। একসময় 39 একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত ছিল এই এস্টেট; ছিল মূল প্রাসাদ, নাটমন্দির, একাধিক মন্দির, বিশাল পুকুর আর খোলা প্রাঙ্গণ। সংরক্ষণের অভাবে আজ ভবনটি জরাজীর্ণ, তবু এর গায়ে লেগে আছে জমিদারি আমলের গল্প আর মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন।
ইতিহাস: ব্যাঙ-সাপের গল্প থেকে জমিদার বাড়ি
মুন্সি বাড়ির গল্পের শুরু ব্যাঙ আর সাপের এক অদ্ভুত ঘটনা দিয়ে — এমনটাই বলে স্থানীয় জনশ্রুতি। শিকারে বেরিয়ে হাতির পিঠে বসে বিনোদী লাল মুন্সী দেখলেন, একটি ব্যাঙ একটি সাপকে গিলে খাচ্ছে। সেকালের বিশ্বাস ছিল — যেখানে ব্যাঙ সাপকে ধরে খায়, সেখানে বসতি গড়লে ধনসম্পদ লাভ হয়। দৃশ্যটি তাঁর মনে গেঁথে গেল।
বিনোদী লাল মুন্সী ছিলেন কাসিমবাজার এস্টেটের একজন মুনসেফ। ওই এস্টেটের জমিদার কৃষ্ণনাথ নন্দীর মৃত্যুর পর (1844 সালের 31 অক্টোবর) তাঁর স্ত্রী মহারানী স্বর্ণময়ী জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব নেন। মহারানীর অধীনে বিনোদী লাল বার্ষিক মাত্র 100 টাকা খাজনায় ধরণীবাড়ী এস্টেটের জোতদারি ভোগ করতেন। সেই বিশ্বাস থেকে তিনি মহারানীর অনুমতি নিয়ে এই জায়গায় বসতি স্থাপন করেন। পরে তাঁর পালকপুত্র শ্রী ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সী এখানে গড়ে তোলেন দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ। প্রাসাদের একটি শিলাখণ্ডে 1880 খ্রিস্টাব্দের উল্লেখ রয়েছে — ধারণা করা হয়, সেই সময়ই মূল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়।
পরবর্তী ইতিহাস অবশ্য মসৃণ ছিল না। 1960 সালে নিঃসন্তান অবস্থায় ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সীর মৃত্যু হলে তাঁর স্ত্রী আশলতা মুন্সী বিহারীলাল নামের এক তরুণকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘ আইনি জটিলতা দেখা দেয়; সম্প্রতি এ বিষয়ে আদালতের রায় এসেছে বলে জানা গেছে।
স্থাপত্য ও কারুকাজ
মুন্সি বাড়ি ব্রিটিশ ও মোগল স্থাপত্যরীতির মিশ্রণে নির্মিত — তৎকালীন জমিদারি স্থাপত্যের একটি চমৎকার উদাহরণ। মূল ভবনের নিচতলায় রয়েছে তিনটি বড় কক্ষ, আর ওপর তলায় ছিল বিশ্রামাগার। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ভবনে বানানো হয়েছিল বাঘের মুখের আকৃতির কারুকাজ করা ড্রেন — এটাই ছিল বাড়িটির সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য।
প্রাসাদ ঘিরে ছিল নাটমন্দির ও পাঁচটি মন্দির — দুর্গামন্দির, বিষ্ণুমন্দির, গোবিন্দ মন্দির ও শিবমন্দির; ছিল স্নানাগার, রান্নাঘর, অঙ্কন ঘর আর মন্দিরের উন্মুক্ত মঞ্চ। মূল ভবনের সামনে এখনো রয়েছে বিশাল সূর্য-জলাশয় পুকুর ও পুরনো কূপ। একসময় এসব নিয়ে প্রায় 39 একরের বিস্তীর্ণ এস্টেট গড়ে উঠেছিল; কালের পরিক্রমায় ও অবৈধ দখলে এখন এর এক-তৃতীয়াংশও অবশিষ্ট নেই বলে জানা যায়।

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত ও বর্তমান অবস্থা
1971 সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এই ঐতিহাসিক বাড়িতে হামলা চালায়। প্রাসাদের একটি কক্ষে সংরক্ষিত ছিল ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সীর তৈলচিত্র-প্রতিকৃতি — বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তা নষ্ট করে দেওয়া হয়। সেই আঘাতের চিহ্ন আজও দেয়ালে দেখা যায়; সামনে দাঁড়ালে মনে হয় ইতিহাস যেন চোখের সামনে কথা বলছে।
আজ বাড়িটির মূল ভবন জরাজীর্ণ। একটি কক্ষে চলে স্থানীয় ভূমি অফিসের কার্যক্রম, আরেকটিতে রাখা আছে পুরনো নথিপত্র। স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি — দ্রুত সংস্কার করে বাড়িটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নিয়ে সংরক্ষিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক।

যা যা দেখবেন
বাড়ির চত্বরে ঢুকলে প্রথমে চোখে পড়বে মূল প্রাসাদ ভবন — জরাজীর্ণ হলেও এর কাঠামো আজও জমিদারি আমলের গৌরবের কথা বলে। তারপর একে একে ঘুরে দেখুন —
- মূল প্রাসাদ: নিচতলার তিনটি বড় কক্ষ, দেয়ালে 1971 সালের বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন আর টিকে থাকা স্থাপত্যকাঠামো।
- নাটমন্দির ও মন্দিরগুলো: দুর্গামন্দির, বিষ্ণুমন্দির, গোবিন্দ মন্দির, শিবমন্দির ও নাটমন্দির — জমিদার আমলের ধর্মীয় স্থাপত্যের নিদর্শন।
- সূর্য-জলাশয় পুকুর: মূল ভবনের সামনে বিশাল এই পুকুর, পাশে মন্দিরের উন্মুক্ত মঞ্চ ও পুরনো কূপ।
- বাঘমুখো ড্রেনের কারুকাজ: বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের বাঘের মুখাকৃতির ড্রেনগুলো ছিল এই বাড়ির অনন্য বৈশিষ্ট্য।
- পুরনো প্রাঙ্গণ: শ্যাওলা ধরা দেয়াল, খোলা চত্বর আর গ্রামীণ পরিবেশ — ছবি তোলার জন্য চমৎকার জায়গা।
জমিদার বাড়ির স্থাপত্য দেখতে ভালো লাগলে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি নিয়ে আমাদের গাইডটিও পড়তে পারেন।
কিভাবে পৌঁছাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে কুড়িগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে উলিপুর হয়ে ধরণীবাড়ী যাওয়াই মুন্সি বাড়ি পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ উপায়।
| রুট | মাধ্যম | সময় (প্রায়) | ভাড়া (প্রায়) |
|---|---|---|---|
| ঢাকা → কুড়িগ্রাম | বাস (গাবতলী/মহাখালী থেকে) | 7-9 ঘণ্টা | 700-1000 টাকা |
| ঢাকা → রংপুর/কাউনিয়া | ট্রেন | 8-10 ঘণ্টা | শ্রেণিভেদে 500-1200 টাকা |
| রংপুর → কুড়িগ্রাম | বাস | 2-3 ঘণ্টা | 150-250 টাকা |
| কুড়িগ্রাম → উলিপুর | বাস/অটোরিকশা | 45-60 মিনিট | 50-100 টাকা |
| উলিপুর → মুন্সি বাড়ি (ধরণীবাড়ী) | রিকশা/অটোরিকশা | 20-30 মিনিট | 30-60 টাকা |
ভাড়া ও সময় পরিবর্তনশীল; যাত্রার আগে হালনাগাদ তথ্য জেনে নিন। ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের বাসের অনলাইন বাস টিকিট কাটতে পারেন, আর ট্রেনে যেতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে টিকিট বুকিং গাইডটি দেখে নিন।
সেরা সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীতকালই মুন্সি বাড়ি ভ্রমণের সেরা সময়। এই সময় আবহাওয়া শীতল ও শুষ্ক থাকে, ফলে খোলা প্রাঙ্গণ ও পুরনো ভবন ঘুরে দেখা আরামদায়ক হয়।
| সময় | আবহাওয়া | ভ্রমণ উপযোগিতা |
|---|---|---|
| অক্টোবর – মার্চ | শীতল ও শুষ্ক | সেরা সময় |
| এপ্রিল – জুন | গরম ও আর্দ্র | সকাল বা বিকেলে ঘোরা যায় |
| জুলাই – সেপ্টেম্বর | বর্ষা | প্রকৃতি সবুজ থাকে; যাতায়াতে সতর্ক থাকুন |
যোগাযোগ
মুন্সি বাড়ি কোনো টিকিটভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। তাই দর্শনের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক ফোন নম্বর বা বুকিং ব্যবস্থা নেই — শুধু ঠিকানা জেনে গেলেই চলে।
ঠিকানা: মুন্সি বাড়ি, ধরণীবাড়ী ইউনিয়ন, উলিপুর, কুড়িগ্রাম। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা 999-এ কল করুন।
ভ্রমণ টিপস
সকাল সকাল পৌঁছে ধীরে ধীরে ঘুরুন, স্থানীয় মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন আর স্থাপনার কোনো ক্ষতি করবেন না — এটাই মুন্সি বাড়ি ভ্রমণের প্রধান নিয়ম।
- সকালের দিকে গেলে ভিড় কম থাকে, ছবি তোলার আলোও ভালো পাওয়া যায়।
- পানি, হালকা খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখুন; আশেপাশে ভালো খাবারের দোকান নাও মিলতে পারে।
- ভবনটি জরাজীর্ণ — দেয়ালে ঠেলা দেওয়া, ওপরে ওঠা বা ভাঙা অংশে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- প্রাঙ্গণে বা পুকুরপাড়ে আবর্জনা ফেলবেন না; ঐতিহাসিক স্থাপনার মর্যাদা রক্ষা করুন।
- কুড়িগ্রাম শহরে থাকার ব্যবস্থা আছে; 1 থেকে 2 দিন সময় রাখলে আশেপাশেও ঘোরা যায়।
উলিপুর ও কুড়িগ্রাম সম্পর্কে আরও জানতে বাংলা উইকিপিডিয়ার উলিপুর উপজেলা নিবন্ধ এবং বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন দেখতে পারেন।
মুন্সি বাড়ি কোথায় অবস্থিত?
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ধরণীবাড়ী ইউনিয়নে এই জমিদার বাড়ি। কুড়িগ্রাম শহর থেকে উলিপুর হয়ে রিকশা বা অটোরিকশায় যাওয়া যায়।
মুন্সি বাড়ি কত বছরের পুরনো?
প্রায় 200 বছরের পুরনো এই বাড়ির শিলাখণ্ডে 1880 খ্রিস্টাব্দের উল্লেখ আছে; সেই সময়ই মূল ভবনের নির্মাণ শেষ হয় বলে ধারণা।
মুন্সি বাড়ি কে নির্মাণ করেন?
জনশ্রুতি অনুযায়ী মহারানী স্বর্ণময়ীর অনুমতি নিয়ে বিনোদী লাল মুন্সী বসতি গড়েন; পরে তাঁর পালকপুত্র শ্রী ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সী প্রাসাদ নির্মাণ করেন।
ঢাকা থেকে মুন্সি বাড়ি কিভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে বাসে 7-9 ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, সেখান থেকে 45-60 মিনিটে উলিপুর হয়ে ধরণীবাড়ী যাওয়া যায়। ট্রেনে রংপুর বা কাউনিয়া হয়েও আসা যায়।
মুন্সি বাড়ি যাওয়ার সেরা সময় কখন?
অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীতকাল সেরা। এই সময় আবহাওয়া শীতল ও শুষ্ক থাকায় পুরনো ভবন ও প্রাঙ্গণ ঘোরা আরামদায়ক হয়।
মুন্সি বাড়িতে কি প্রবেশ ফি লাগে?
না, এটি টিকিটভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র নয় — প্রবেশে ফি নেই। তবে ভবনটি জরাজীর্ণ, তাই সতর্ক থেকে স্থাপনার ক্ষতি না করে ঘুরুন।
