সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান: এক নজরে

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায়, রঘুনন্দন পাহাড়ের কোলে ২৪৩ হেক্টর চিরসবুজ বন নিয়ে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান (প্রতিষ্ঠা ২০০৫)। নামের অর্থই পরিচয় — বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাতটি ছড়া (পাহাড়ি ঝরনা-খাল) থেকেই “সাতছড়ি”। ঢাকা থেকে সড়কপথে মাত্র ~১৩০ কিলোমিটার — রাজধানীর সবচেয়ে কাছে থাকা প্রকৃত গভীর বনগুলোর একটি। কিন্তু খ্যাতির আসল কারণ এর প্রাণবৈচিত্র্য: বিপন্নপ্রায় উল্লুকের (western hoolock gibbon) ডাক শোনা যায় এমন হাতে গোনা বনগুলোর একটি এটি; সঙ্গে আছে ~১৪৯ প্রজাতির পাখি, চশমাপরা লাঙ্গুরসহ ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী আর ২০০-র বেশি প্রজাতির গাছ। চারদিকে চা-বাগানঘেরা এই বন পাখিপ্রেমী ও ট্রেকারদের কাছে গোপন রত্ন।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ঘন বন, হবিগঞ্জ
সাতছড়ির চিরসবুজ বন। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Reaz Uddin Rana, CC BY-SA 4.0)

কি দেখবেন

উল্লুকের ডাক: ভোরে বনে ঢুকলে দূর থেকে ভেসে আসে উল্লুকের যুগল-ডাক (“হু-লক” ধ্বনি) — সাতছড়ির সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। গাইডের সাহায্যে ভাগ্য ভালো থাকলে গাছের চূড়ায় ঝুলে থাকা উল্লুক পরিবার দেখাও যায়। সঙ্গে চশমাপরা লাঙ্গুর (capped langur) ও লেজ-শুকর বানরের (pig-tailed macaque) দল ঘোরে।

পাখি দেখা: ~১৪৯ প্রজাতি — লালমাথা ট্রোগন, ধনেশ (oriental pied hornbill), বনমোরগ, নানা প্রজাতির শালিক-বুলবুলি-কাঠঠোকরা। শীতে পরিযায়ী যোগ হয়। পাখিপ্রেমীদের জন্য সকাল ৬–৯টা সেরা সময়।

তিনটি ট্রেইল: ছোট ট্রেইল (~৩০ মিনিট) যায় বনের ভেতরে থাকা ত্রিপুরা আদিবাসীদের গ্রাম টিপরাপাড়া পর্যন্ত (~২৪ পরিবার); মাঝারি ট্রেইল (~১ ঘণ্টা) বনের গাছগাছালি ও প্রাণীর আবাস ঘুরে দেখায়; লম্বা ট্রেইল (~৩ ঘণ্টা) পৌঁছায় আগর বাগান পর্যন্ত — অভিজ্ঞতা ও সময় অনুযায়ী বেছে নিন।

ছড়া ও বন-ঝরনা: সাতটি ছড়ার স্বচ্ছ পানি আর শুকনো মৌসুমে ছড়ার বালুময় তলে জীবাশ্ম-গাছের চিহ্ন — বনের ভেতরের এই খালগুলোই প্রাণের ধারা।

ট্রি অ্যাডভেঞ্চার: পার্কে গাছের ওপরের প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম চালু আছে (আলাদা ফি, অবস্থা গেটে জেনে নিন)।

চারপাশের চা-বাগান: পার্কের চারদিকে নয়টি চা-বাগান — পশ্চিমে সাতছড়ি চা-বাগান, পূর্বে চাকলাপুঞ্জি। বনভ্রমণের সঙ্গে বাগানঘেরা সড়কের সৌন্দর্য ফ্রি।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের বনপথ, হবিগঞ্জ
বনের ভেতরের হাঁটার পথ। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (Reaz Uddin Rana, CC BY-SA 4.0)

প্রবেশ ফি ও নিয়ম

ধরন ফি (সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী)
প্রাপ্তবয়স্ক (বাংলাদেশি)১১৫ টাকা
অপ্রাপ্তবয়স্ক/শিক্ষার্থী৫৭ টাকা
বিদেশি পর্যটক১০ মার্কিন ডলার
গাড়ি পার্কিংছোট ১১৫ / বড় ২৩০ টাকা

ফি বন বিভাগের তালিকা অনুযায়ী পরে বদলাতে পারে — গেটের টাঙানো তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নিন। সরকারি তথ্য: বন অধিদপ্তর ও হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন। কঠোর নিয়ম: পার্কের ভেতরে রাত্রিযাপন নিষেধ — সন্ধ্যার আগেই বন থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।

কিভাবে যাবেন

ট্রেনে: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনে শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশন (পারাবত/জয়ন্তিকা/উপবন) — সেখান থেকে সিএনজিতে সরাসরি পার্কের গেট (~৩০–৪০ মিনিট)। ট্রেন যাত্রার ধারণা: সিলেট–শ্রীমঙ্গল ট্রেন গাইড।

বাসে: ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের যেকোনো বাসে তেলিয়াপাড়া/শায়েস্তাগঞ্জ নেমে সিএনজি — গেট মহাসড়কের কাছাকাছিই।

ব্যক্তিগত গাড়িতে: ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক > শায়েস্তাগঞ্জ > চুনারুঘাট সড়ক; গেটে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে।

কোথায় থাকবেন ও খাবেন

থাকা: পার্কের ভেতরে থাকা যায় না। বেস হিসেবে সবচেয়ে ভালো — হবিগঞ্জ শহর (সাধারণ হোটেল) অথবা কাছাকাছি বাহুবলের বিলাসবহুল দ্য প্যালেস রিসোর্ট; অনেকে শ্রীমঙ্গলে থেকে (~৩০ কিমি) দিনের ট্রিপ করেন — সিলেট অঞ্চলের থাকার তালিকা দেখুন সিলেটের সেরা হোটেল ও রিসোর্টে। বন বিভাগের অনুমতিতে রেস্ট হাউস/ক্যাম্পিংয়ের সুযোগ মাঝে মাঝে থাকে — গেলে অফিসে খোঁজ নিন।

খাবার: গেটের বাইরে ও চুনারুঘাট সড়কে ছোট খাবার দোকান; দিনের খাবার সঙ্গে নেওয়া নিরাপদ পরিকল্পনা (পলিথিন-প্যাকেট বনে ফেলবেন না)। একই সিলেট-সার্কিটে মিলিয়ে নেওয়া যায় রাতারগুল ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানও।

টিপস ও সতর্কতা

  • গাইড ছাড়া গভীর বনে ঢুকবেন না — পথ হারানো সহজ, আর বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার জন্যও গাইড জরুরি; গেটেই স্থানীয় গাইড পাওয়া যায় (ফি আগেই ঠিক করুন)।
  • বর্ষায় জোঁক প্রচুর — লম্বা মোজা পরুন, সঙ্গে লবণ/চুন রাখুন; জোঁক টান না দিয়ে লবণ ছিটিয়ে ছাড়ান।
  • বানর-লাঙ্গুরকে খাবার দেবেন না, খাবারের ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে রাখবেন না — ছিনিয়ে নিতে পারে।
  • বনের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল/নেই — গ্রুপসঙ্গীকে পরিকল্পনা জানিয়ে যান।
  • উল্লুক-পাখি দেখার সেরা সময় ভোর — গেট খোলার সঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করুন; নীরবতা বজায় রাখুন।
  • টিপরাপাড়ায় গেলে সম্মানজনক আচরণ করুন; অনুমতি ছাড়া কারো ছবি তুলবেন না।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান কোথায়?

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায়, রঘুনন্দন পাহাড়ে — ঢাকা থেকে ~১৩০ কিমি; ২৪৩ হেক্টর চিরসবুজ বন, প্রতিষ্ঠা ২০০৫।

সাতছড়িতে কি কি প্রাণী দেখা যায়?

বিপন্নপ্রায় উল্লুক, চশমাপরা লাঙ্গুর, লেজ-শুকর বানরসহ ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও ~১৪৯ প্রজাতির পাখি (ট্রোগন, ধনেশ, বনমোরগ)।

সাতছড়ি নাম কেন?

বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাতটি পাহাড়ি ছড়া (খাল) থেকে এই নাম।

সাতছড়ির প্রবেশ ফি কত?

সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি ১১৫ টাকা, শিক্ষার্থী ৫৭ টাকা, বিদেশি ১০ ডলার — গেটের তালিকা মিলিয়ে নিন।

ঢাকা থেকে সাতছড়ি যাবো কীভাবে?

ট্রেন/বাসে শায়েস্তাগঞ্জ বা তেলিয়াপাড়া, সেখান থেকে সিএনজিতে সরাসরি পার্কের গেট।

পার্কে রাতে থাকা যায়?

না — ভেতরে রাত্রিযাপন নিষেধ, সন্ধ্যার আগে বেরিয়ে আসতে হয়; থাকতে হয় হবিগঞ্জ শহর/শ্রীমঙ্গলে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top