সংক্ষেপে

  • জিরো পয়েন্ট ঢাকার গুলিস্তান মোড়ে অবস্থিত — বাংলাদেশের সড়ক দূরত্ব মাপার কেন্দ্রবিন্দু; দেশের সব দূরত্বের হিসাব শুরু হয় এখান থেকে।
  • 1987 সালের 10 নভেম্বর গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনের স্মরণে চত্বরটির নাম এখন নূর হোসেন স্কয়ার।
  • আশপাশে হাঁটা দূরত্বে সাধারণ ডাকঘর, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ও বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম; একটু দূরে শহীদ মিনার, কার্জন হল, আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লা।
  • ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস, রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা বা রাইড শেয়ারিংয়ে সহজেই পৌঁছানো যায়।
  • ঘোরার সেরা সময় সকাল 8টা থেকে 10টা; বছরের সেরা মৌসুম নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি।

সূচিপত্র

ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকা গুলিস্তানের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি চত্বর, যেখান থেকে শুরু হয় বাংলাদেশের দূরত্বের হিসাব। নাম তার জিরো পয়েন্ট — দেশের যেকোনো প্রান্তের দূরত্ব যখন ঢাকা থেকে মাপা হয়, সেই মাপের শুরু এই পয়েন্ট থেকেই। তবে এই জায়গা শুধু মাপকাঠির একটি বিন্দু নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গণতন্ত্রের জন্য আত্মত্যাগের রক্তাক্ত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের স্মরণে আজ এটি পরিচিত নূর হোসেন স্কয়ার নামে।

জিরো পয়েন্ট: রাজধানীর কেন্দ্রবিন্দু

জিরো পয়েন্টের অবস্থান গুলিস্তান মোড়ে, সাধারণ ডাকঘরের কাছাকাছি। বাংলাদেশের জাতীয় মহাসড়কসহ সব সড়কের দূরত্ব এখান থেকে পরিমাপ করা হয় বলে একে দেশের “মাইল জিরো” বলা চলে। মাইলফলকে যখন লেখা থাকে “ঢাকা 120 কিমি”, সেই 120 কিলোমিটারের গণনা শেষ হয় এই চত্বরেই।

গুলিস্তান রাজধানীর সবচেয়ে কর্মব্যস্ত এলাকাগুলোর একটি। সচিবালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বড় বড় মার্কেট আর দূরপাল্লার বাস টার্মিনাল — সব মিলিয়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে মানুষের ঢল নামে। এই ব্যস্ততার মাঝেই জিরো পয়েন্ট দাঁড়িয়ে আছে ঢাকার প্রতীকী কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে — শহরের হৃৎস্পন্দন যেখানে সবচেয়ে জোরে শোনা যায়।

জিরো পয়েন্ট ঢাকা
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (CAPTAIN RAJU, CC BY-SA 4.0)

নূর হোসেন স্কয়ার হওয়ার গল্প

জিরো পয়েন্টের বর্তমান নামের পেছনে আছে 1987 সালের 10 নভেম্বরের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। সেদিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকায় “ঢাকা অবরোধ” কর্মসূচি চলছিল। বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন — বুকে সাদা রঙে লেখা “স্বৈরাচার নিপাত যাক”, পিঠে “গণতন্ত্র মুক্তি পাক” শ্লোগান নিয়ে। জিরো পয়েন্টের কাছেই পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদ হন।

নূর হোসেনের এই আত্মত্যাগ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়; 1990 সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর চত্বরটির নামকরণ করা হয় নূর হোসেন স্কয়ার। প্রতি বছর 10 নভেম্বর পালিত হয় শহীদ নূর হোসেন দিবস, আর এই স্কয়ার হয়ে ওঠে গণতন্ত্রকামী মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের স্থান। নূর হোসেনের জীবন সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন উইকিপিডিয়ার নূর হোসেন নিবন্ধ।

আশপাশে ঘুরে দেখার মতো জায়গা

জিরো পয়েন্টকে কেন্দ্র করে হাঁটা বা অল্প দূরত্বে ঘুরে দেখা যায় ঢাকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান। চাইলে একদিনের সফরেই এই জায়গাগুলো দেখে নেওয়া যায়।

  • সাধারণ ডাকঘর (জিপিও): চত্বরের কাছেই ঢাকার কেন্দ্রীয় ডাকঘর; ব্রিটিশ আমলের এই ভবন স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয়।
  • বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ: বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ; গুলিস্তান থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ।
  • বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম: দেশের প্রধান ক্রীড়া ভেন্যুগুলোর একটি; খেলার দিনে এলাকাজুড়ে উৎসবের আমেজ থাকে।
  • শহীদ মিনার: ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ; রিকশায় বা হেঁটে যাওয়া যায়। বিস্তারিত জানতে দেখুন উইকিপিডিয়ার শহীদ মিনার নিবন্ধ।
  • কার্জন হল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার লাল ইটের ঐতিহাসিক ভবন; পড়ুন কার্জন হল ভ্রমণ গাইড।
  • আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে নবাবদের গোলাপি প্রাসাদ, বর্তমানে জাদুঘর; দেখুন আহসান মঞ্জিল ভ্রমণ গাইড।
  • লালবাগ কেল্লা: অসমাপ্ত মুঘল দুর্গ; পুরান ঢাকার ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। পড়ুন লালবাগ কেল্লা ভ্রমণ গাইড।
নূর হোসেন স্কয়ার
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (CAPTAIN RAJU, CC BY-SA 4.0)

যেভাবে যাবেন

গুলিস্তান ঢাকার প্রধান পরিবহন হাব হওয়ায় জিরো পয়েন্টে পৌঁছানো খুবই সহজ — শহরের প্রায় সব রুটের বাসই গুলিস্তান হয়ে চলাচল করে।

পরিবহন মাধ্যম কোথা থেকে সুবিধাজনক আনুমানিক ভাড়া (টাকা) আনুমানিক সময়
বাস মিরপুর, উত্তরা, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী 15 – 40 30 – 90 মিনিট
রিকশা শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরান ঢাকা 40 – 100 15 – 30 মিনিট
সিএনজি অটোরিকশা ঢাকার যেকোনো এলাকা 150 – 300 20 – 45 মিনিট
লেগুনা সদরঘাট, কেরানীগঞ্জ রুট 20 – 50 25 – 60 মিনিট
রাইড শেয়ারিং ঢাকার যেকোনো এলাকা 120 – 350 20 – 50 মিনিট

নোট: ভাড়া ও সময় যানজটের ওপর নির্ভর করে কমবেশি হতে পারে; যাত্রার আগে হাতে বাড়তি সময় রাখুন।

ঘোরার সেরা সময়

জিরো পয়েন্ট ঘোরার সবচেয়ে ভালো সময় সকাল 8টা থেকে 10টা — তখন যানজট তুলনামূলক কম থাকে, আর আশপাশের স্থাপনাগুলোও ধীরেসুস্থে ঘুরে দেখা যায়। অফিস সময় (সকাল 9টা থেকে বিকেল 5টা) ও সন্ধ্যায় গুলিস্তানের যানজট চরমে ওঠে, তাই এই সময়টা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

বছরের হিসেবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি — শীতকাল — ঢাকায় ঘোরাঘুরির জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। শুক্রবার সকালে এলাকা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা থাকে, তবে সেদিন অনেক মার্কেট বন্ধ থাকে। আর 10 নভেম্বর এলে স্কয়ারে শহীদ নূর হোসেন দিবসের কর্মসূচি দেখার সুযোগ মেলে — ইতিহাসকে কাছ থেকে অনুভব করার এক অনন্য মুহূর্ত।

যোগাযোগ

ঠিকানা: জিরো পয়েন্ট (নূর হোসেন স্কয়ার), গুলিস্তান, ঢাকা।

জিরো পয়েন্ট একটি উন্মুক্ত জনস্থান; এর কোনো অফিসিয়াল ফোন নম্বর বা টিকিট কাউন্টার নেই। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা 999 নম্বরে কল করুন।

ভ্রমণ টিপস

  • ব্যস্ত রাস্তা পারাপারে ফুটওভার ব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করুন; গুলিস্তানের ট্রাফিক অনভ্যস্তদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
  • ভিড়ের মধ্যে মোবাইল, মানিব্যাগ ও মূল্যবান জিনিস সাবধানে রাখুন।
  • যানজটের কথা মাথায় রেখে হাতে বাড়তি সময় নিয়ে বের হন।
  • গরমের দিনে সঙ্গে পানির বোতল ও ছাতা রাখুন।
  • গুলিস্তানের মার্কেটে কেনাকাটা করলে দরদাম করে কিনুন।
  • পরিবার নিয়ে গেলে দিনের আলো থাকতেই ঘোরা শেষ করার চেষ্টা করুন।

জিরো পয়েন্ট কোথায় অবস্থিত?

জিরো পয়েন্ট ঢাকার গুলিস্তান মোড়ে, সাধারণ ডাকঘরের কাছাকাছি অবস্থিত। বাংলাদেশের সব সড়কের দূরত্ব এখান থেকে পরিমাপ করা হয় বলে এটি দেশের দূরত্ব মাপার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।

জিরো পয়েন্টকে নূর হোসেন স্কয়ার কেন বলা হয়?

1987 সালের 10 নভেম্বর গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনে নূর হোসেন এই চত্বরের কাছে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তার স্মরণে পরবর্তীতে জিরো পয়েন্টের নামকরণ করা হয় নূর হোসেন স্কয়ার।

জিরো পয়েন্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এটি বাংলাদেশের সড়ক দূরত্ব পরিমাপের কেন্দ্রীয় রেফারেন্স পয়েন্ট — দেশের যেকোনো স্থানের দূরত্ব ঢাকা থেকে হিসাব করার সময় গণনা শুরু হয় এখান থেকে। পাশাপাশি এটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের স্মারক।

জিরো পয়েন্টের আশপাশে কী কী দেখা যায়?

সাধারণ ডাকঘর, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও শহীদ মিনার কাছাকাছি অবস্থিত। একটু দূরে গেলে কার্জন হল, আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লা ঘুরে দেখা যায়।

জিরো পয়েন্ট ঘোরার সেরা সময় কখন?

সকাল 8টা থেকে 10টা ঘোরার সেরা সময়, কারণ তখন যানজট তুলনামূলক কম থাকে। বছরের মধ্যে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি — শীতকাল — ঢাকায় ঘোরাঘুরির জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক।

জিরো পয়েন্ট দেখতে কি টিকিট লাগে?

না, জিরো পয়েন্ট দেখতে কোনো টিকিট লাগে না। এটি একটি উন্মুক্ত জনস্থান; যেকোনো সময় এখানে যাওয়া যায়। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা 999 নম্বরে কল করা যায়।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top